সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

 সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা











আত্মজ

একটি বীজ ভিক্ষে করে
এনেছিল পাখি,
এনেছিল আত্মীয়দের ছায়া ও বাসস্থান।
আজ এইখানে -
গাছতলে বসে থাকা পথিক
তুমি কি জেনেছ পূর্ব আত্মজ?
 
বটফল ভেঙে তুমি দেখো
সহস্র সবুজ পাতার কাঁপন,
রোদ ঝিকিমিকি
মা পাখিটির ঠোঁটের মতন।
 

শেষ পৃষ্ঠায়

পিঁপড়ের জন্য ভাত বাড়েনি কেউ
পিঁপড়েও চায়নি
বাড়া ভাতে ছাই,
দুধে-ভাতের গৃহস্থই চেয়েছে সে।
 
কবিতার খাতায় একদিন
ঢুকে পড়েছিল পিঁপড়ে
পংক্তি থেকে দু-একটি অক্ষর
মুখে নিয়েছিল সে।
মানুষের ভাষা বুঝতে না পেরে
সাদা পাতাকে ভাত ভেবে
পিঁপড়ে মরে পড়েছিল
খাতার শেষ পৃষ্ঠায়...
কবিতাহীন।

বহুরূপী

খড়্গের গায়ে মরচে লেগেছে।
রক্তমাখা জিভ
সংসারের প্রাণপাত যাপনচিত্র,
গলার মুন্ডুমালায়
অভুক্ত সন্তানের মুখচ্ছবি!
এভাবেই দুয়ারে দাঁড়ায়।
 
ঝোপের আড়ালে
দেবী সাজা পুংলিঙ্গে পেচ্ছাব করে,
কাঁধের ঝোলায় মাগনের নৈবেদ্যটুকু
ঘরে ফিরছে।

কলসি

কুমোরপাড়া থেকে
কলসি বেচতে আসে,
দু'সের ধানে একটি কলসি
গাঁ-ঘরে এভাবেই বিক্রি হয়
সমস্ত কলসি।
কলসির ভেতর ছায়া
কলসির ভেতর তৃষ্ণা
আর কি দিয়ে কলসি বেচো তুমি?
 
বিনি পয়সার কলঙ্ক
টলমল!

অক্ষমতা

গভীর নলকূপ থেকে জলের বদলে
শব্দই উঠে আসে শুধু ,
শব্দে ছায়া নেই
শব্দে হাওয়া নেই।
আমি কেবল
আকাশের দিকে মুখ করে
মা-পাখিটিকে খুঁজি,
খুঁজি তার ডানার ছায়া
খুঁজি তার কোমল হাওয়া।
 
দীর্ঘক্ষণ পাখি না এলে
আমি দু'হাত প্রসারিত করি,
অক্ষম ডানা দুটি আমার
থরথর করে কাঁপে
কাঁপে মনুষ্যজীবন...
 

গোলপোস্ট

জাবরকাটা মন্হর সন্ধ্যা নামল মাঠে। সবুজ ঘাসগুলো তখন আবছা অন্ধকারে তাদের চিকন হারাচ্ছে। মাঠের দু'প্রান্তে ছায়াকাঠির মতো জেগে আছে দু'টি গোলপোস্ট। খেলাহীন, প্রতিপক্ষ নেই। রাতচরা গাভীটির ক্ষুরের শব্দে বুটজুতোর আওয়াজ শোনা যায়। একটি তারাখসা কর্ণার কিক হয়ে উড়ে আসছে গোলপোস্টের দিকে। রেফারির কালো বাঁশিটি গলায় ঝুলিয়ে মিটমিট করছে চাঁদ।
 
এক গোলপোস্ট থেকে আরেক গোলপোস্টে গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকার...

বাগালবন্ধু

ছাগল দুধ ভেড়ার দুধ কতবার খেয়েছি পলাশ খালায়। গোঠের পৈরাগ বাউরী আমার বাগালবন্ধু। মোষের পিঠে চড়িয়ে আমাকে দেখায় বিস্তীর্ণ চতুঃষ্পদী দেশ। পশুদের রাগ ও রমণ। হেমন্তের সূর্যাস্তে রক্তজলে ঝরে পড়া গর্ভফুল। হাঁটতে না পারা শাবককে কোলে নেয় পরম মমতায়। প্রতিটি গৃহপালিত তার মুখস্থ। প্রতিটি গোয়ালে সে নিজেকে গচ্ছিত রাখে পশুদের সাথে। পৈরাগের রোদ পোড়া পিঠে আমাকে শোঁকায় গবাদির গন্ধ। সবার অলক্ষ্যে আমিও হাম্বা ডেকে উঠি।


কে শব
(করোনা পর্ব)

শবযান পৌঁছে দিয়েছে শ্মশানে। ড্রাইভার পেয়ে গেছে ভাড়া ও বকশিস। এখন মধ্যদুপুর, তুমি ছাড়া শ্মশানযাত্রী নেই। মৃত বাবা আর জীবন্ত সন্তান। কোন আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কেউই আসেনি এই পারাপারে। মুঠো করে উড়িয়ে দিলে লৌকিকতার খই, কয়েকটি ধাতব মুদ্রা। একা একা সাজিয়ে ফেললে দাহকাঠ। বাবাকে তুলে নিলে শিশুর মত - শুইয়ে দিলে। আগুনেরা দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ল চিতায়। একা মানুষের পাশে অসংখ্য আগুন।

শবদাহ শেষ। নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে অবশিষ্ট পোড়াকাঠ। এখন আর মৃত বাবাও নেই। তুমি শুধু একা। শ্মশানও ভয় পাচ্ছে।

ঘুড়ি ও লাটাইচালক

আকাশের নীল দেখে ছাদে আজ ফুটেছে বিকেল। মধ্যিখানে ঘুড়ি ওড়ে পিপাসা সম্বল। প্রতিদিন ছেড়েছি সুতো তেরো নদী পার। চেয়েছি কাটা যাক ঘুড়ি, উড়ুক আনুগত্যহীন। এসব চলাচল আসলে ইশারাপূর্ণ, মহাশূন্যে কথোপকথন। রোদ গোটানো শেষ হলে আঁধার নামে সম্মতি প্রস্তাবে। তোদের ছাদে তখন ডানা ছেঁড়া প্রজাপতির মতো পড়ে থাকে ঘুড়ি , অদৃশ্য লাটাইচালক।

মাথামুণ্ডু

মাথাটা পাওয়া যাচ্ছে না। ধড়েরও ছটফটানি নেই। মুশকিল হল মানুষেরা চিনতে পারছে না ধড়টা কার! ছিন্নমস্তার গল্প বলে থেমে গেল কেউ কেউ। ওখানে মাথাটা হাতে আছে বলে। তবে কি কোনো চিত্রকরের কাজ?  মাথা ছাড়া মানুষের কথা বলা। পুকুরে কিম্বা নদীঘাটে নানান মূর্তি বিসর্জন হয়। খড়ের আদলে কেউ কেউ রোদ পোহায়, মুণ্ডুহীন।
 
একদিন ধড়ের হাতে তুলে দিলাম কলম। দেখি দিকে দিকে কনিষ্করা কবিতা লিখছেন অসংখ্য...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন