জয়ন্ত দত্তের কবিতা
কারখানা-সাইরেন,সরাইখানা ও অন্যান্য
কারখানা আর তার সামনে সরাইখানাটির বন্ধুত্ব অনেক দিনের। একজনের ঘুম ভাঙে কাকডাকা ভোরে।রাতজাগা সরাইখানা সারাটাদিন ঝিমোয়। কারখানার সাইরেনে হুঁশ ফেরে তাঁর। রাত্রির ক্লেদ মুছে নিজের জীবনে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টায় সারাদিন কাটিয়ে... সন্ধ্যেবেলা আবার চুল বাঁধে। খোঁপায় ফুল গুঁজে নকল রানী সাজে সে...।
কারখানায় লোহা গলানো হয়। সরাইখানায় মন।
বাবাকে নিয়ে গল্প
সকলেরই উচিত তার বাবার গল্প জানা
একদিন খুব করে বায়না ধরেছিলাম
বাবা,তোমার গল্প শুনবো
শৈশব,কৈশোর,যৌবন ও জীবনের গল্প
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা বলেছিলেন
আমার কোনো গল্প নেই
ব্যর্থ মানুষের কোনো গল্প থাকে না
বাবার দীর্ঘশ্বাসের চেয়ে দীর্ঘ
কোনো গল্প আজও শোনা হয়নি
এই আফসোস নিয়ে আমিও একদিন
বাবা হয়ে গেলাম...
হাসপাতাল করিডোরে
চোখের তারায় দীপ্ত আভা ভরা শান্ত বাস্তুভিটা
অতীতে যাব বলে খুলে নিই নিজেকে
একটু গোছালো সাধারণ নীরবতায়
নেমে আছে আলকাতরার মত কেশ
শ্যাম্পুরা কেমন অস্থির চোখে
নামিয়ে এনেছে সোনালী চাঁদ।
আমার ভেতর একাদশীর ছায়া দীর্ঘ হয়
আসলে কি ছায়ারা বৃদ্ধ হয়!
শব্দের চেয়ে নৈঃশব্দের তীব্রতা
আমাকে এনে দেয় হাসপাতাল করিডোরে
চারিদিকে মেডিসিন কর্নার
ক্লিন প্যাসেজ ও সাদা এপ্রোন
পাটিসাপ্টার মতো কেউ শুয়ে আছে
আর তার হলুদ পা কেমন ঠান্ডা
হিম হিম শিহরণ,শান্ত ফোয়ারা
নেমে আসছে কোথাও...
বিসমিল্লাহ-বসন্ত
উথাল পাথাল
বিসমিল্লা সন্ধ্যায়
উপন্যাস পর্দা টানে
প্রতিবিম্ব শামুক হাঁটে
উত্তেজনার আলোক অন্ধে
ধারাপাত ওজন ওঠেনামে
যোগবিয়োগের স্লেটে...
ফুলসেতু উঠে এলে
জ্যোৎস্না খসে পড়ে বুকের খোপায়
বসন্তের পাতা পড়ে
গান-গল্প-কবিতায়
হাজার অমাবস্যায় তাজ
পূর্ণিমা আনে...
রোজকার মওত
কেউ না কেউ মরে প্রতিদিন
দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে কিংবা রাস্তায় মাথা কুটে
সেই মৃত মানুষটি আবার উঠে দাঁড়ায়
মাথা নীচু করে বাড়ি ফেরে
খুব স্বাভাবিক ঘটনা যেন।
সেদিন হঠাৎ লুকিয়ে লুকিয়ে আমার মরা দেখলাম
দেখলাম থ্যতলানো শরীর পড়ে রয়েছে রাস্তায়
অনেক লোক সেখানে জমা হয়েছে
নিজেদের মধ্যে কথা বলছে
কারও মুখে ভয়,কারও বা
ঘৃণা।
এ যেন একধরনের খেলা
সকলেরই কোন না কোন দিন এমন হয়ে থাকে।
একটা লুকোচুরি খেলার মতন সকলেই নিজের মৃত্যু দেখে
শব দেখে
আমার মতই লুকিয়ে দেখে।
তারপর ভাঙাচোরা হাত,পা ও থ্যতলানো মুখ নিয়ে ধীরে ধীরে
উঠে দাঁড়ায়
অবশেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়...
বিকেল-ব্যালকনিতে বৃষ্টির রিংটোন
যতবার মেঘ করে আসে
বৃষ্টিফোঁটা গায়ে পড়ার আগেই ফোন আসে
কোথায় তুমি!চেয়ে দ্যাখো বৃষ্টি হচ্ছে...তোমার বৃষ্টি
আমি বৃষ্টি দেখি আর ভাবতে থাকি
মেয়েটা কি সত্যিই পাগল!
কথার ছলে একবার মাত্র বলেছিলাম
আমি বৃষ্টি ভালবাসি...খুব ভালবাসি
তারপর থেকেই নিয়মিত ফোন
ওপাশ থেকে সেই চিরপরিচিত কণ্ঠস্বর
কোথায় তুমি!দ্যাখো বৃষ্টি আসছে...তোমার বৃষ্টি
অবাক হই বরাবরের মতো --এ যেন বৃষ্টিকেই বলা
তুমি ফিরে এসো বারেবারে.. .
মেয়েটা শুধু জেনে গেল আমার ভাললাগার কথা
কেবল অজানা রয়ে গেল
আজকাল বৃষ্টি এলে ঘরের দরজা জানালা
বন্ধ রাখি আমি...
অনন্যা, শুধু তোমার জন্য
যতগুলো রাত অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায় নিদ্রাহীন ছিলে
গুনে গুনে ঠিক ততোগুলো নক্ষত্রের বুকে লেখা হয়েছে
তোমার আত্মকথন।
ঠিক যেদিন আকাশ আসমানী নীল থেকে
আস্তে আস্তে গাঢ় নীলে পরিণত হয়েছে
আমি যতবার আর্তনাদ করেছি
ঠিক ততবার তোমার কান্না ভেসে এসেছে
আমার উঠোনে...
তোমার কারণে যতগুলো সাগর মরুদ্যান হয়েছে
আমার অপেক্ষায় ঠিক ততগুলো মরুদ্যান সাগরে পরিণত হয়েছে
তোমাকে ভালো না বাসলে বুঝতেই পারতাম না
পৃথিবীর বুকে এখনো অলৌকিক কিছু আছে
শৈশবের সলতে
হারিকেন-এর মধ্যে সলতে আর কেরোসিন এর প্রেমে আগুন জ্বলছে।
আমি সেই আগুনের আলোয় অঙ্ক করতে বসেছি। ক্লাস ফোর। ল.সা.গু. আর গ.সা.গু.। ৮,১০,১২,১৫ এবং ২০
এর ল.সা.গু. বের করলাম ১৮০। বাবা পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মন দিয়ে
অঙ্ক করো। রেজাল্ট ১৮০ না,
১২০ হবে।
১৮০ কেটে ১২০ লিখতে লিখতে তাকিয়ে দেখি,শৈশবের সলতে বয়সের কেরোসিনে ডুবে গেল।
লাইক
কে কে বুড়ো আঙুল ছোঁয়ালো...
সকাল-দুপুর-রাত্রি ছুঁয়ে যায় চোখ চেনা অচেনার মুখে মুখে!
ছবিও লেখার গুরুত্ব গর্বে হৃদয় সিঁড়ি বায় থেকে থেকে...
নানা রঙের ফুল ফোটে বাগান ভর্তি মনে
মৌমাছির গান বেরিয়ে আসে অন্তরনির্যাস হৃদয় পাঁজর ভেঙে...
লাইকই ভেঙে দেয় যত সব
পথ
কালবৌশাখি পথের উত্তরণে
ভালবাসা যখন শিকারি
ভালবাসা কখনো ভীষণ তুখোড় একগুঁয়ে। জেদি অব্যর্থ এক
শিকারি যেন! সে একটি বাঘকে ফাঁদে ফেলে মারবার জন্য একটি ছাগল
ছানাকে গাছের তলায় বেঁধে রাখে। আর বাঘও শিকারের ডাক শুনে গন্ধে গন্ধে,পা টিপে এগিয়ে আসে। খানিক
চেয়ে দেখে। দেখতে দেখতে খেলতে আরম্ভ করে। একটু খেলা না হলে ভালবাসা ঠিক জমে না। অর্থাৎ
পা টিপে টিপে একটু কাছে যাওয়া। আবার পিছিয়ে আসা। প্রদক্ষিণ করা। প্রদক্ষিণ করতে
করতে দূরত্বটাকে কমিয়ে নিয়ে আসা। ওত পাতা এবং তারপর এক লাফ। ওদিকে ভালবাসাও
সুযোগ বুঝে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে। তাই লাফ দেওয়ার সাথে
সাথেই শেষ...