কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা

কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা




ছুঁচসুতো

 

সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই

যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম

আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস

আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো

অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে

সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক

 

ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি, 

ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই

গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ

 

বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল 

টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান

এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি

কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে 

 

সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই

রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!




নাটুয়া 

 

গভীর ইঁদারাটির কাছে যাই, উঁকি মারি 

ভেতরমহলে কার, নাটুয়া শরীর!

প্রতিবিম্বে শুয়ে আছি অনন্ত তরল

জাগতিক ভ্রম মেখে অসম্ভব স্থির

 

শঙ্খলগ্ন নিয়ে কত যে বলার ছিল কথা

তিলের বিলাপ নিয়ে জটিল বিভ্রম 

হৃদিপদ্মটিতে এতদিন কাঙালপণায় 

ছিল যে রেণুবিলাস, তার কথা বলতে পেরেছি কই!

ঝরে ঝরে পড়ে গেছে অসমাপ্ত শ্রম

 

মধুলোভি মৌমাছিদের চক্রাবর্ত পথে 

নিস্ফল খুঁজেছি কিছু জান্নাতের ঘোর

সিঁঁধ কেটে নিয়ে গেছে মহাকাল চোর

 

অন্নদামঙ্গল আজও হয়নি তো পড়া 

মোহিনীরূপের ভেতরে যে

কুচযুগ মেধাবী বর্ণনা, এখনও অধরা

 

কুয়োর অতল তলে পড়ে আছে নাটুয়া শরীর 

পরনে পোশাক এক জাদুকর মায়া, জাদুর ধরম

                                      শত শত চুমকি বসানো

 

ভীষণ ধাঁধিয়ে দিই দর্শকের দৃষ্টির বিভ্রম



 

মেছুনী 

 

মেছুনির নিজেরই শরীর যেন বঁটি হয়ে থাকে

ইস্পাত কঠিন তার ভীষণ ধারালো 

ফালাফালা কেটে যায় খদ্দেরের চোখ 

পিছল শরীর তবু চরম নাব্যতা ধরে

কার্ভেচার আর ক্লিভেজের ঘরে 

থরে থরে সাজানো বন্দিস

 

মেছুনির সোমত্ত শরীরে রেণু হয়ে লেগে থাকে 

                                                    খদ্দেরের ভ্রম

ভ্রমের ভেতরে পরকীয়, অনন্ত পিপাসা

মাছের আঁশটে গন্ধ ঘেটে দেয় 

                                            ঘোরের বিভ্রম

 

বঁটির উপরে ফালা হয়, আসঙ্গ লিপ্সার থেকে 

লাফ দিয়ে নেমে আসতে চাওয়া বাঘ

 

উদাসীন মেছুনি এসবই জানে

মাছের আঁশের নিচে ঘন হয়ে জমে থাকে 

                                                     পদ্মগোখরোর থুতু

ছিটকে গেলে অন্ধ হবে কামুক বায়স

 

মরা মাছ খণ্ড খণ্ড কেটে দিতে দিতে

ভ্রূক্ষেপবিহীন সেই আগুনে মেছুনী 

শরীরী বঁটিতে আরো কৌশল ঢুকিয়ে 

নেড়ে দেয় খদ্দেরের পৌরুষের থলি

 

মরা মাছ নিয়ে থলি হাতে বাড়ি যায় সম্মোহন



 

এমন জলের কাছে 

 

এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল

তারও তো আছে এক চিত্রল হরিণ,

নিভন্ত কপাট খুলে যখন বেরিয়ে আসে 

জায়নামাজ তুলে রেখে কবিতা পড়তে বসে গালিব…

 

এমন জলের কাছে আশ্চর্য ফুটুনি নিয়ে 

কখনও যেওনা পরাশর 

তাহলে কোনদিনও পাবেই না তোমার মৎস্যগন্ধাকে… 

 

দেখবে তখন, সিন্ধুঘোটকেরা প্রকৃত দর্শন ভুলে 

এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে 

সমুদ্রতটে ঘুমিয়ে থাকা ঝিনুকের বুক।

 

এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল, 

দেখ তার থরথর ঠোঁট, ঠোঁটের অলিন্দ বেয়ে

গড়িয়ে গড়িয়ে নামা রাধিকা অসুখ...



 

যজ্ঞভূমি

 

বেড়া বাধার কালে ওপাশে বন্ধন দড়িটি 

শক্ত করে ধরে রাখে যে, সেই তো আমার মা!

তবু তার গর্ভজলের গন্ধ পেয়েও বুঝতে পারিনা 

ব্রহ্মাণ্ড থেকে উঠে আসা জগৎ সর্পভ্রমে রজ্জু নয়

আর এই জগতের নাভিমধ্যে যে কুয়ো, সেখানে 

ডুব দেওয়া সহজ কথা নয়, যে পারে সেই পারে, 

তখন তার শরীর হয়ে ওঠে সেই কাঠবেড়ালির,

উন্মাদ হয়ে যে খুঁজে ফেরে প্রকৃত যজ্ঞভূমির...

 

অতলান্ত সাগরের ঢেউগুচ্ছে আলো জ্বেলে বসে আছে 

যে রমনী, তাকে একবার মা বলে ডেকে দেখ, 

ব্রহ্মের নাভি থেকে বেরিয়ে আসা শক্তির দোলা খেতেই

ডিঙি নৌকা হয়ে উড়ে যাবে অসীমের দিকে...

 

সেখানে তো কোনও পাহাড় নেই কেবল অতলের মুখ…

 

মৃত্যুর ভেতর থেকে বের হয়ে 

কতকাল ধরে লেগে থাকা অপমান মুছে

তপস্যায় যাবে সেই প্রাচীন শম্বুক...



 

মধুযামিনী

 

এমন যে রূপকল্প তার কাছে থিতু হয়ে বসি।

দেখি, সে রূপের মঞ্জরি সকল, 

অক্ষর প্রতিমা হয়ে ওরা সব ভ্রমর-ভ্রমরী,

মিথুনমূরতি মাখা রাধা মাধবের ঘাটে জলকেলি করে...

বিদ্যুৎ তরঙ্গ এসে এঁকে দেয় আলিঙ্গন কুসুম অগ্নিতে...

 

নৌকাবিলাসের দিকে এখন যাব না কিছুতেই,

উবু হয়ে বসে দেখে যাব রতিকল্প রূপ,

বৈষ্ণবের রসকলি সাজের ভেতরে

দেখব কেমন কুঞ্জবন আঁকা,

রাধাকৃষ্ণ লীলা খেলে রাসের বিস্ময়,

ললিতা বিশাখা আর চন্দ্রাবলী ঘোর...

 

এমন রূপের কাছে বসে, 

যেন গেয়ে যেতে পারি গোবিন্দের গীত, 

রাইয়ের নূপুর থেকে তুলে নিতে পারি

পয়মন্ত পরকীয়া ঘোর...

 

যেন বলতে পারি,

এই যে স্মরণে আছি সেই কি যথেষ্ট নয়?

মধুযামিনীতে ব্রহ্মকমল ফুটুক হিরন্ময়… 



 

পরাগ দোতারা

 

পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসি, ছায়া পড়ে জলে

আনন্দ-সাঁতার ধরে মাছেরা অবাক হয়ে দেখে,

জাগতিক ভ্রম মেখে কাছে আসা আশ্চর্য মানুষ!

 

জলের উপরে উঠে পাখনা নেড়ে ইশারা দেয় কত,

যেন বলে, পড়েছ কি চন্ডীদাস, পদাবলী কথা? 

রাধিকার বিনোদিয়া বিভঙ্গের ঝরে পড়া আলো

দেখেছ কেমন খুঁজে নেয় পরকীয়া বাঁশিটির

ছিদ্রপথ আলোকসম্ভব? আনপথে নূপুরের ধ্বনি 

মিলনের কাঙালপনায় জেগে ওঠা কীর্তনবাসর,

অথবা দেখেছ কোন চর্যার হরিণ,

অঙ্গ বেয়ে ঝরে পড়া নীলাভপ্রণয়?

 

বলি না কিছুই শুধু মাছেদের দেখি, আনন্দ-হ্লাদিনী…

তারা কেউ একাকিত্বে ভোগে না কখনও,

বেঁধে বেঁধে থাকে আর এ-ওর গায়ের থেকে

খুঁটে খুঁটে তুলে দেয় জমে থাকা শ্যাওলা প্রয়াস…

 

পুকুরের জল থেকে ছায়াটি তুলতে গিয়ে দেখি, 

রতিমুগ্ধ বসে আছে সিদ্ধাসনে, কবেকার 

রামী-চন্ডীদাস!



 

পতন 

 

জল পতনেরও একটা মাধুর্য আছে 

যখন তা নেমে আসে বৃষ্টি ফোঁটা হয়ে...

এসময় কিশোরী মেয়েরা এই ভার্চুয়াল সময়েও 

গোপন কুলঙ্গী থেকে বের করে তাদের নূপুর

রাই না হলেও চন্দ্রাবলী ঘোর হয়ে 

নৃত্য করে অনাবিল পিছল উঠোনে...

 

তাদের মায়েরা পুজো ঘর থেকে উঠে এসে দেখে 

মেয়েদের নাচের মুদ্রায় কত বৃন্দাবন গাঁথা হয়ে আছে...

 

অথবা ঝরনা পতনের কথা ভাবো,

মানুষের দৃষ্টি কুড়োবে বলেই অবিরাম নগ্ন থেকে নগ্নতর...

এই পতন পবিত্র বড়, প্রকৃতিগ্রন্থিত

এমন পতনের কাছে ঈশ্বরও পেতে দেয় তার হাত

যেন এক সম্মোহিত অনন্ত কাঙ্গাল...

 

স্নানঘরে জলের পতন নিয়ে কত কবি লিখেছে কবিতা...

মেঝেময় পড়ে থাকা মেয়ের স্নানের জল থেকে 

স্নেহটুকু গোপনে কুড়িয়ে রাখে সুজাতার পিতা…



 

নাচের ইস্কুল থেকে

 

নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসে যে আলোস্রোত

তার নাম ধরে নাও ঘুঙুরবিলাস...

মোহনিয়া রূপ, দেবদারু বন দিয়ে যখন ভ্রমণ 

দেবদাসীরাও উছলিয়া উতলিয়া 

কুড়োতে থাকে তার প্রসব করা শস্যদানা,

ক্যাকটাসের শরীরে বেজে ওঠে পাতাল তরল... 

 

কে এঁকেছ ব্ল্যাকবোর্ডে দাঁত দেখানো ষাঁড়?

শোনোনি অলকানন্দা অথবা গহরজান?

অনুরাগ যেদিন চুইংগাম হয়ে আঁকড়ে ধরবে দিল

আরশিনগর খুব তোলপাড়,

তখন বুঝবে ধনী, বনজ্যোৎস্নার  

আকর্ষের প্রয়োজন তো পড়েনা কোনোদিন...

 

কে এঁকেছ নকশি কাঁথায় হরিণের মাংস উত্তাপ?

নদী যখন বয়ে যাবে নৌকা সোহাগে, তার ঢেউগুলি দেখ,

তারা সব নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসা

এক-একটি পাখি,

যাদের কোনও উপমা নেই

শুধু লিরিক্যাল মুদ্রা আর কত্থকের স্রোত...



 

পাথরের কাছে 

 

পাথরের কাছে যাই 

দেখি, প্রাণ আছে, পাখির কোমল ধ্বনি 

শোনা যায় পাতা হলে কান... 

 

রজস্বলা সমুদ্রের ঢেউগুলি গোপন নির্জন

অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে, যেন

নিজস্ব শিহর পেলে জেগে উঠবে এখনই 

 

সান্দ্র আবেগের থেকে নেচে নেচে নেমে আসে 

শ্যামের বাঁশিটি আর রাধিকা নূপুর...

 

দেখি, এক পথও আছে কুঞ্জের ঘরানা...

 

পাথরও বলেছে কথা, ভেতরমহলে এসো

উট আছে মরুভূমি, কাঁটাগুলি উদ্গাত প্রাণা...


 

 


সুমিতা মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

 সুমিতা মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

 

প্রতিশোধের টিয়ার


 

তুখোর দিনের প্রতিশ্রুতি যদি আবেগতাড়িত করে -

 

       খসখসে বাস্তব, শ্রান্ত ঘাম-জলে ভিজে যাওয়া ইচ্ছা,

মেঘলা মনের ডানায় না ফেরা ঠিকানার চাওয়া,

কিংবা অনেক হেঁটেও না পাওয়া পথ-

যদি রঙধনু এঁকে দেয় শ্রাবনের আকাশ।

কসম চান্দাদিঘী, সদ্য বিধবা বটতলা-

আজন্ম সমান্তরাল বয়ে চলা, ওহে রেললাইন!

ভেবে নিবো-তুমিই আমাকে ডাকছো,

স্মৃতির আঙিনায়।

 

ধুলো জমা রাজপথে ভুল করা শপথ!

আত্মার ফুঁৎকারে হিংসার মরিচগুড়ো,

প্রতিশোধের টিয়ার, বারুদের গন্ধ, অথবা

দ্রোহের চিৎকারে যদি গর্জে উঠে প্রান্তর, শ্লোগানে প্লাবনে

ভেবে নিবো-তুমিই আমাকে ডাকছো,

মিছিলের সীমানায়।

 

ভুল ফুল বুননে-জোনাক মালা স্বপ্নের আকুতি,

দুপুর না হতেই, সন্ধ্যার আঁধারে ঝরে যাওয়া গোধূলি বিকেল

তার আঁতুড়ঘরে পুড়ে মরা বেঁচে থাকা-

কান্নার রঙে ধুয়ে যাওয়া প্রেম,

যদি আলো হাতে ফিরে আসে, এ আকাশ আঙিনায়।

ভেবে নিবো, তুমিই আমাকে ডাকছো-

শোকের মিছিল নয়, দ্রোহের প্রলয় মশালে

সে আলোর দ্রোহে, নিষ্পাপ আকুতির কলিজার মতো

প্রনয়ের নৈবদ্যে মুগ্ধতায়,

অবেলার গোধূলি-আর তার ফিরে যাওয়া জোছনায়...!!!

 


 

বানভাসি


 

অযাচিত জল নেমে গেলে

বিবস্ত্র এই বানভাসি হৃদয়ের

পাঁজরে লেগে থাকে হাজারো দুঃখ গাথা

ছিন্ন কলমীলতা আর জলজ। ফুলের আলপনায়

মেদুর এই ক্যানভাসে আঁকা হয়

প্রাচীনতর কোন এক মেঘলা দুপুর।

 

সাঁকো পেরিয়ে ছোট্টবেলার আকাশ,

শতাব্দী পুরোনো শালিকের ঠোঁট

বিগত দিনের পেলব সন্ধ্যা খুঁটে খুঁটে খায়,

কীচক কান্নার মতো ধূসর মনকথা আর

উঠোন জুড়ে জীবনের জলছাপ;

গোপন অক্ষরে লেখা হয়

অন্তরঙ্গ কিরার ইতিকথা যত।

 

বেয়াড়া বৃষ্টির কথকতায় রাত বাড়ে,

কচি কলাপাতা রঙের বউ

আজ জাগরী ভীষণ,

অনিবার্য বেদনায় বুকের কিনারে জমা হয়

সব হারানোর গান

এই সব শব্দ শবের মান্দাসে বুঝি

ভেসে যায়

আরো এক বিপন্ন বর্ষাযাপন।

 

 

চুম্বন

 

 

জেগে উঠি অবিবাহে জেগে উঠি রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে পৌষ মাঘের

প্যাস্টেলের বারো রঙে জেগে উঠি বোমা বিস্ফোরণের শব্দে,

 

আর কী আশ্চর্য এতদিন আমি

অখণ্ড গীতবিতানের প্রেক্ষাপটে

মজে ছিলাম কেমন অনন্তের বাণী আর মাধুরী উৎসবের  ঠিক মাঝখানে

একটি নিঃশ্বাস রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম প্রেমিক প্রেমিকার মতো রোজ

হাতে রক্ত মুখে রক্ত জেগে উঠি আর আর

কখনো জেগে উঠব না ভেবে।।

  

কুটিল ঘূর্ণিঝড় থেকে টেনে নাও

চুম্বকের মতো

তোমারই একান্ত সম্মোহনী চুম্বনে।।

 


 

নশ্বরতা


 

পোশাক পরার মত সহজ অভ্যাসে

বিভিন্ন ভূখন্ড থেকে জীবনকে দেখে যাই,

 

মাঝে মাঝে সফল রোদ্দুরে দেখা যায়

বেদনা ও ধুলোর প্রবাহ!

 

পৃথিবীতে অবিরত রসনা সংযত করে যে পরিবেশন করে -

তাকে দিন কখনো বা রাত্রি মনে হয়,

 

উৎসে পৌঁছে লক্ষ্য করি -চতুর্দিকে ব্যাপ্ত নশ্বরতা;

সফল প্রয়াসে তবু সকল জাহাজ বন্দরের দিকে যায়.

 

চোখ যা থেকে উৎসারিত সৌন্দর্যের মৃত্যু হলে

বাতাসে করুণ এক অভিনয় চলে,

 

পাতা কি কখনো বোঝে ফুলের আতঙ্ক?

আশ্চর্য সংশয় শুধু সব দিকে সব পাতা দোলে।।

 


 

বর্ণপরিচয়


 

গত সাত বছর সকাল থেকে সন্ধ্যে হন্য হয়ে আমি

সত্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম সম্প্রতি কাগজে জানলাম

লেকের ধারে তরুণীসহ উচ্ছৃঙ্খলতার দায়ে ধরা পড়ে

সে নাকি এখন হাজতে আছে

 

বিদ্যাসাগর মাতামহ কি ভয়ংকর কান্ড. দেখুন

এই আন্তর্জাতিক মহিলাদিবসে ‘বর্ণপরিচয়’ দ্বিতীয়  ভাগ

থেকে পালিয়ে সত্য বেমালুম লম্পট হয়ে গেল

আপনাকেও কিছু না জানিয়ে

 

তালতলার সেই প্রসিদ্ধি বাদামি চটিপায়ে একটু

তাড়াতাড়ি নেমে আসুন গোলদীঘির বেদি থেকে

আদালত যেতে হবে জামিন তদ্বিরে তা নাহলে পুলিশের হাতে

সত্য বেচারা বেঘোরে মারা যাবে।।

 

 

রূপান্তর


 

বোবা পাথরেরা কথা বলছে,

বোবা মেঘেরা নীরবে হাসছে।

আর, সকল রাত্রির শেষে,

মৃত্যু আলো হয়ে, অন্ধকারে ভাসছে।

 

     পৃথিবীর পল্লবিত শাখায় - শাখায়

অনেক রৌদ্রসফল রূপান্তর দেখে,

আলোকের অলীক বিন্যা‌সে

নিয়তিকে আগুন জেনেছি।

    

প্রস্তুতি তো ছিলই, তবু

মূর্ত আকস্মিক ধ্বংস সংসারে;

একবগ্গা খেয়াল কি আর বাঁচাতে কিছু পারে?

চারিদিকে পড়ে থাকে সমস্ত ভঙ্গুর......

শুধু একটা কোথাও না পৌঁছানো

খুব উঁচু সিঁড়ি দাঁড়িয়ে থাকে

আকাশের দিকে মুখ করে -

আসছে বসন্ত ।।

 

 

ম্যারাথনের দৌঁড়


 

মিথ্যেমিথ্যি অমোঘ কিছু কথা, হাজার কথা রাখার ঘোরানো সিঁড়িদের হারানো - প্রাপ্তি -নিরুদ্দেশ অথবা, অন্য গ্রহ থেকে চলকালো ধূমায়িত রোদের মুখ চিরে কেমন ম্যারাথন রাত্রি

একা একা মশাল নিয়ে যাওয়া

তোমারই আঙ্গুলে মায়া ছিল, রোদ বক্র ক্রমপরিমান, বলেছিলে লম্বা সফর শেষে

               যতদিন কথা না দেওয়া

 

ততোটুকু মাস বর্ষ আগ্রহ সমাপন না জেনে, আমাদের কথকতা হবে, যদি তার সন্মতি থাকে,

যদি তার রিক্ত থাকে অলিন্দ নিলয়

এখনো বন্দর থেকে চুপিচুপি চলে আসে বাহু বোতামের ভাঙ্গা ঘর

চিঠিরা উচ্চারিত। আরো শব্দঘোর হলে দেখা

অসম্পূর্ণ তারাদের গতি নুয়ে যাবে অবগাহনের আগে।।

 

 

ফ্ল্যাশ ব্যাক



বাতাসের এপার ওপার

অরূপের আশ্চর্য দুয়ার.

 

মাটির সোঁদা গন্ধে কবিতা ভালই আছে,

অন্ধ ছুটির দিন

বন্ধ দরজায় ---

কড়া নাড়বে না আর কোনদিন কেউ ।

শিশির ভেজা ছন্দে কবি তো ভালই আছে,

কিভাবে এসেছে এপথে

কেনই বা বিশ্রাম এতো ---

ইটের ফলক তুলে খুঁজবে না কেউ ।

দাঁড়াও পথিকবর --- মাইকেল স্বর ভাসে,

তিষ্ঠ ক্ষণকাল

দারিদ্রেও কবিতা বাঁচে ---

এতক্ষণে বিষাদের সুর সাধে কেউ ।

কুঞ্জবিহারী নামে পাখিদের কূজন মিশে রয়েছিলো বলে

কতবার ডাকি কুঞ্জবিহারী ততবার অতীত কেঁদে ওঠে

 

যে শব্দগুলো চাইনি কোনদিন

তার নিঃশব্দ আত্মারা

কেন যে সশব্দে অট্টহাসে...।

যে দৃশ্যগুলো ভুলে যেতে চাই

তারাই স্বপ্ন গভীরে

কেন যে সদৃশ তাণ্ডব নাচে...।

যে অনুভুতিদের ফেলেছি ডাস্টবিনে

তাদের অসহ্য দুর্গন্ধ

কেন যে পচিয়ে দেয় মেধা...।

যে জীবন চাইনি কোনদিন

তাদের বায়স্কোপে

যেন দেখা যায় ফ্ল্যাশব্যাক...।।


 

ট্রাজেডি


 

মজ্জাহীন জীবন থেকে খুলে নিতে পারি না জড়তা,

 

ক্ষমাহীন অক্ষমতার বিবর্ণস্তুপে

দিতে পারি না আগুন।

 

পাতালের সঙ্গীত চৌচির করে আমায়

টুকরো টুকরো কল্পনায় খন্ড জীবন।

 

ঢেকে যায় স্থবিরতার পচা গালা বোধ

নড়াতে পারি না ভিত আর্থ কবির বর্ণমেলা।

খরস্রোত তার মধ্যে এই সমস্ত দুরন্ত পৃথিবীর

চিহ্ন মুছে যায় শুধু এই বিশাল নদীর পাজরে।

 

তোমার জন্ম তরুর মূল আর শাখা

আমার রাস্তায় অনেক কাঁটা, অনেক আঁকা -বাঁকা।

 

অকাল কঙ্কাল ছায়াময় স্বপ্নময় কলকাতা

দায়িত্বহীন স্বেচ্ছাচারী অজ্ঞান বৈশাখী

উম্মাদ নৃত্যের তালে তালে

কাঁপি দেওয়ালে বারান্দায় পর্দায়।

নিস্তরঙ্গ হ্রদের ওপারে দাঁড়ানো

একাকী বাতিঘর ঝাপসা।

 

বিহ্বল কিছু সুখ অসহ্য রূঢ়তার মতো

ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় আমার -

আজম্ম ভিক্ষাপাত্র।

জলের শূন্যতায় ভেসে যায়

জীবন বিমার ডাইরি।।

 

 

অবৈধ কিনা

 


পায়ে পায়ে ফিরে যাই অন্ধ কোটরে

কাপুরুষ --- তা কি করে হয়,

ভালবাসা --- ভরা ছিল মগজ জঠরে

তবু আত্মা কেন বলে --- যাসনে ।

 

অনর্গল বৃষ্টিতে চলে ভিজে অক্সিজেন

কাপুরুষ ---চাবুক চালাতে চায়,

ভালবাসা --- কণ্ঠনালীতে দেয় ধ্বনি

তবু প্রেম কেন বলে কাছে আয় ।

মেঘের বাস আকাশের চড়াভূমি

 

বারে বারে তোমার অশ্রু সিক্ততায় ভিজি

রোজনামচা তোমায় বোঝাই,

দেখা অদেখায় তোমার অবাধ্যতায়

বারে বারে নিজের পরজন্ম খুঁজি ।

বারে বারে বৃষ্টি ধারার আড়াল বেয়ে

তুমি এসো অসময়ে সূর্যকিরণ সয়ে,

তোমার বহমানা ঘামে খেটে খাওয়া মানুষের

নিভৃত অবাধ্যতায় ---

বারে বারে নির্লোভ স্বতঃমৃত্যু খুঁজি ।।