সুবোধ ঘোষ এর কবিতা

সুবোধ ঘোষ এর কবিতা










একটি চলমান ছবি   

প্রতিটি কাশফুলের নীচে
একটি করে ঢাক নামানো আছে, আর--
ঢাকি ধ্বনি দিয়ে এঁকে চলেছে দুর্গামূর্তি। 
পায়ের তলায় নদী বহে যায় বারোমাস
কারো অনায়াস পারাপার কারো ভিজে কাপড়ের খুঁট
যার পায়ে পথের আলপনা
চোখে ভাত রঙ, সেও নতুন সুতোর গন্ধ শুঁকে। 
যে ছেলেটির পাঁজর গুনে ফেলি এমন উৎসবে
তাঁর কপালে নামিয়ে রাখি ঠোঁট--
বাঙালির উঠোন ভর্তি লোকের মাঝে তাঁর অবাক চেয়ে থাকায়
শিউলি ঝরে যায়।


কক্ষ পথ 

মাথার উপর সর্বোচ্চ জোরে চলছে পাখা
পৃথিবীর গতির থেকে নিতান্তকম, এখন এই ঘূর্ণন দেখে
আমি যদি পাখা টিকে পৃথিবী ভাবি তাহলে
আমি পৃথিবীর বাইরে--
এই যে মধ্য রাত্রি,  নীরবতা ঘণ হচ্ছে পাড়ায়
যেন শ্মশানে বসে রাত্রির স্তব্ধতা মাপছি
যদি ইচ্ছে হয় সূর্য দেখবো তাহলে রাত্রি মিথ্যে হয়ে যাবে
রাত্রি মিথ্যে নয়, ব-কলমে সূর্য আছে অন্য নামে
অথচ বুঝতে পারি আমাকে কেউ ভাঙছে
আমি ছড়িয়ে পড়ছি ঘরে, পাড়ায়
আমাকে খোঁজার জন্য পাখা ঘুরছে
মন খারাপ করে  বসে থাকছে পাড়া
আমি দেখেছি সারাদিন যত ছায়া ফেলেছি
রাত্রিতে তার চিহ্ন থাকে না।


ঝরা পাতা ও আগুন

পাতা ঝরে ঝরে যেভাবে মাটি গোপন করে
তা সহ্যের বাইরে
মাটির বুকে পা তুলে এমন শুয়ে থাকে  যেন
এর জন্যই তাদের ঝরে ঝরে আসা। 
আমি রোজ তাদের এক জায়গায় করে
মাটিতে  হাত রাখি--
ওদের কোন শরীরী উষ্ণতা পাইনা
বরং দিন দিন হাড় মাস আলাদা হতে থাকে
ততদিনে বোঁটায় দুধ শুকিয়ে গেছে  , 
এমন ই একদিন ভাবি ওদের গা থেকে
মুছে গেছে গাছ গাছ গন্ধ
আগুন দিই, জ্বলে ওঠে, ছাই হয়ে যায়
বাতাসে যখনই উড়ে ছাই, দেখি
মাটিতে গাছের ছায়া পড়ে।


মাছ 

তুমি টেবিলে সমূদ্র নামিয়ে রাখো
মাছ খেলা করে, চুমু খায়, ঝগড়া করে
পাথুরে বিছানায় হেঁটে যায় ---
বদ্ধ জীবনের ঘৃণা ছুঁড়ে দেয় জলের উপর মুখ তুলে
কিছু জলজ উদ্ভিদ  স্থির থাকে, তার
আড়াল থেকে  টিপ্প নী দেয় ঠোঁট বাকিয়ে
এ সবের কোন ধ্বনি তোমার কানে যায় না। 
কোনদিন কান পেতেছো কাঁচের দেওয়ালে? 
মাছেদের আকাশ নেই
সূর্য নেই, নেই চাঁদ, তারা--
বৈদ্যুতিক বুদবুদে ওরা শরীর সেঁকে নেয়। 
মরা ঝিনুকে ঠোক্কর মেরে আয়ু বাড়ায়, তবু
একবারও  দেওয়াল ভেঙে মুক্তি র স্বাদ জাগে না


মোমবাতি ও দেশলাই                       

যে বৃষ্টি ছাতা কে প্রত্যাখ্যান করে
চলো তার মাঝে দাঁড়ায়-
হাতের উপর হাত থাক, চোখের ভেতর চোখ। 
জমে  থাকা জলে ফুলে ওঠা বৃষ্টির অবাক চোখ
হিংসায় ফেটে যাবে--
যে ভাবে মত্ত থাকে মানুষ ছায়ার ভেতর
তারা  আমাদের ওতোপ্রতো ভেসে থাকা
দেখতে দেখতে বুঝে যাবে ঠিক--
হাড় ও মাংসের  মূলত কোন ওজন থাকে না
যা থাকে ,তা নদীর গভীরতা।


সমূদ্র সৈকতে


আমার বাড়িতে মা নামে কোন সিন্দুর কৌটো নেই
পাশ ফিরে শুয়ে থাকা নদীর বিছানার চাদরের মতো
মায়ের সিঁথি--
মায়ের চুড়ির কাছে
পৃথিবীর সকল ধ্বনি কে নতজানু হতে দেখেছি। 
কাপড়ে এখন ফুল ফোটে না মায়ের, রঙ ধরে না
সব রঙ দুরন্ত ঘুর্ণনে এক হয়ে মায়ের কাপড়ে লেগে থাকে--। 
মা হাসে, তবে সব দাঁত বেরোয় না
মা চুল বাঁধে  বড় বড় শ্বাস টেনে
হাওয়ার চাইতে দীর্ঘ শ্বাসে বেশি চুল উড়ে। 
মাঠের এক প্রান্তে মা শুয়ে থাকে, সারা মাঠে বাবার পায়ের ছাপ--
যতবার পাশ ফিরে শুন্যতা ঠেকে হাতে। 
লন্ঠনে এত কিছু লুকিয়ে রাখে মা
আমি দেশলাই গোপন করি--


বুনন


তারপর তুমি পাশ ফিরে শুলে
আমি তারপরও জেগে আছি, মধ্যরাতের নাভি ছুঁয়ে
একটু একটু করে ঘুম জমলো তোমার শরীরে
তুমি আরো অসহায় হয়ে পড়ছো--ভাবটা ঠিক
এক পাখি নিরাপদ হীন ভাবে ডেকে উঠলো
তুমি চিৎ হলে--
পাখি তোমাকে দেখেনি
আমি পাখি দেখিনি
তবু কেমন যেন মানুষ, পাখি, রাত, ঘুম
খুব সুতোয় সুতোয়
তুমি আবার পাশ ফিরলে
আমি রাত্রি কে ঘুমিয়ে যেতে দেখলাম
ঠিক আমার মতো, তোমার মতো।


বন্ধু


তোমার বুকের পরিমাপ না জেনেই
বন্ধু বলেছি-
এর আকার কিছু না থাকলেও আয়তনে বিশ্বময়
বুক ও ঠিক তাইই, ছড়ানো প্রান্তর অন্তহীন। 
বন্ধু শব্দটি অন্যের কাছে মানানসই, তাতে গর্বের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে--
বুকের ভিতর এক সাগর 
লুকানো রতনে নিজেকে ধনী বোধ হয়। 
লুঠ ছুঁড়ে বিবস্ত্র করতে পারো
চোখ থেকে নিঙড়ে নিতে পারো আলো
জীব থেকে কথা কেটে নিলেও
বুক থেকে সাগর সরানো এতটা সহজ নয়
যতো বার সরানোর ছলে রাখবে হাত নীচে
ততবারই পৃথিবীর ভারসাম্য ভুলতে থাকবে তোমার পা।


ছেঁড়া বালিশ ও গান


পূর্ব প্রান্তের  কোণে এক শিশু
বালিশ ছিঁড়ে তুলো উড়াচ্ছে
পশ্চিম দিকে উড়ে যাচ্ছে তুলো, তাঁর--
এই যাত্রাপথ কে নাম দিয়েছি শরৎ। 
নদীও নাছোড়, সেও চেরা পাতার মাঝে
শক্ত কাঠিতে তুলো গুঁজে
ইচ্ছে মতো ঢেলে দিচ্ছে হাওয়া। 
এসব ঘটনার মাঝেই মানুষ  দশকর্মার দোকানে যায়
পুঞ্জীভূত  রঙীন সুতোয় শরীর ঢেকে ধূপ জ্বালবে বলে      । 
দূর্গা রঙের বোঁটায় যে ফুলটি জায়গা দখল করে
তার চোখে জল দেখেও 
ফুটপাতে র শিশুটি  আধো আধো গলায়
থালা বাজিয়ে গান করে।


পা


পা যদি পথ লোভি হয়
দূরত্ব ভুলে যাওয়ায় দোষ নেই
এভাবেই মানুষ তো মানুষের কাছে আসে
মন থেকে আসে নিজের মতো। 
বহুদিন যেন পায়ের কোন লোভ নেই
ডান পায়ের সাথে বাম পায়ের কথা হয়না
ব্যাটারী চালিত পুতুলের মতো তাদের চলন ভঙ্গি
একটি মানুষ থেকে আরেক মানুষের মধ্যে
অনেকখানি পথ--
চলাচল বন্ধ হলে যেভাবে গজিয়ে ওঠে ঘাস, আগাছা
আগামী দিনে এ পথে পা রাখতে সাপের ভয়ে 
পিছিয়ে যাবে মানুষ 
ক্রমশঃ পা  পথের লোভে চঞ্চল না হতে হতে
চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে দেখবে
পা ছাড়াই মানুষ কেমন অন্তহীন যাত্রা য় চলে যায়।

সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

 সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা











আত্মজ

একটি বীজ ভিক্ষে করে
এনেছিল পাখি,
এনেছিল আত্মীয়দের ছায়া ও বাসস্থান।
আজ এইখানে -
গাছতলে বসে থাকা পথিক
তুমি কি জেনেছ পূর্ব আত্মজ?
 
বটফল ভেঙে তুমি দেখো
সহস্র সবুজ পাতার কাঁপন,
রোদ ঝিকিমিকি
মা পাখিটির ঠোঁটের মতন।
 

শেষ পৃষ্ঠায়

পিঁপড়ের জন্য ভাত বাড়েনি কেউ
পিঁপড়েও চায়নি
বাড়া ভাতে ছাই,
দুধে-ভাতের গৃহস্থই চেয়েছে সে।
 
কবিতার খাতায় একদিন
ঢুকে পড়েছিল পিঁপড়ে
পংক্তি থেকে দু-একটি অক্ষর
মুখে নিয়েছিল সে।
মানুষের ভাষা বুঝতে না পেরে
সাদা পাতাকে ভাত ভেবে
পিঁপড়ে মরে পড়েছিল
খাতার শেষ পৃষ্ঠায়...
কবিতাহীন।

বহুরূপী

খড়্গের গায়ে মরচে লেগেছে।
রক্তমাখা জিভ
সংসারের প্রাণপাত যাপনচিত্র,
গলার মুন্ডুমালায়
অভুক্ত সন্তানের মুখচ্ছবি!
এভাবেই দুয়ারে দাঁড়ায়।
 
ঝোপের আড়ালে
দেবী সাজা পুংলিঙ্গে পেচ্ছাব করে,
কাঁধের ঝোলায় মাগনের নৈবেদ্যটুকু
ঘরে ফিরছে।

কলসি

কুমোরপাড়া থেকে
কলসি বেচতে আসে,
দু'সের ধানে একটি কলসি
গাঁ-ঘরে এভাবেই বিক্রি হয়
সমস্ত কলসি।
কলসির ভেতর ছায়া
কলসির ভেতর তৃষ্ণা
আর কি দিয়ে কলসি বেচো তুমি?
 
বিনি পয়সার কলঙ্ক
টলমল!

অক্ষমতা

গভীর নলকূপ থেকে জলের বদলে
শব্দই উঠে আসে শুধু ,
শব্দে ছায়া নেই
শব্দে হাওয়া নেই।
আমি কেবল
আকাশের দিকে মুখ করে
মা-পাখিটিকে খুঁজি,
খুঁজি তার ডানার ছায়া
খুঁজি তার কোমল হাওয়া।
 
দীর্ঘক্ষণ পাখি না এলে
আমি দু'হাত প্রসারিত করি,
অক্ষম ডানা দুটি আমার
থরথর করে কাঁপে
কাঁপে মনুষ্যজীবন...
 

গোলপোস্ট

জাবরকাটা মন্হর সন্ধ্যা নামল মাঠে। সবুজ ঘাসগুলো তখন আবছা অন্ধকারে তাদের চিকন হারাচ্ছে। মাঠের দু'প্রান্তে ছায়াকাঠির মতো জেগে আছে দু'টি গোলপোস্ট। খেলাহীন, প্রতিপক্ষ নেই। রাতচরা গাভীটির ক্ষুরের শব্দে বুটজুতোর আওয়াজ শোনা যায়। একটি তারাখসা কর্ণার কিক হয়ে উড়ে আসছে গোলপোস্টের দিকে। রেফারির কালো বাঁশিটি গলায় ঝুলিয়ে মিটমিট করছে চাঁদ।
 
এক গোলপোস্ট থেকে আরেক গোলপোস্টে গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকার...

বাগালবন্ধু

ছাগল দুধ ভেড়ার দুধ কতবার খেয়েছি পলাশ খালায়। গোঠের পৈরাগ বাউরী আমার বাগালবন্ধু। মোষের পিঠে চড়িয়ে আমাকে দেখায় বিস্তীর্ণ চতুঃষ্পদী দেশ। পশুদের রাগ ও রমণ। হেমন্তের সূর্যাস্তে রক্তজলে ঝরে পড়া গর্ভফুল। হাঁটতে না পারা শাবককে কোলে নেয় পরম মমতায়। প্রতিটি গৃহপালিত তার মুখস্থ। প্রতিটি গোয়ালে সে নিজেকে গচ্ছিত রাখে পশুদের সাথে। পৈরাগের রোদ পোড়া পিঠে আমাকে শোঁকায় গবাদির গন্ধ। সবার অলক্ষ্যে আমিও হাম্বা ডেকে উঠি।


কে শব
(করোনা পর্ব)

শবযান পৌঁছে দিয়েছে শ্মশানে। ড্রাইভার পেয়ে গেছে ভাড়া ও বকশিস। এখন মধ্যদুপুর, তুমি ছাড়া শ্মশানযাত্রী নেই। মৃত বাবা আর জীবন্ত সন্তান। কোন আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কেউই আসেনি এই পারাপারে। মুঠো করে উড়িয়ে দিলে লৌকিকতার খই, কয়েকটি ধাতব মুদ্রা। একা একা সাজিয়ে ফেললে দাহকাঠ। বাবাকে তুলে নিলে শিশুর মত - শুইয়ে দিলে। আগুনেরা দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ল চিতায়। একা মানুষের পাশে অসংখ্য আগুন।

শবদাহ শেষ। নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে অবশিষ্ট পোড়াকাঠ। এখন আর মৃত বাবাও নেই। তুমি শুধু একা। শ্মশানও ভয় পাচ্ছে।

ঘুড়ি ও লাটাইচালক

আকাশের নীল দেখে ছাদে আজ ফুটেছে বিকেল। মধ্যিখানে ঘুড়ি ওড়ে পিপাসা সম্বল। প্রতিদিন ছেড়েছি সুতো তেরো নদী পার। চেয়েছি কাটা যাক ঘুড়ি, উড়ুক আনুগত্যহীন। এসব চলাচল আসলে ইশারাপূর্ণ, মহাশূন্যে কথোপকথন। রোদ গোটানো শেষ হলে আঁধার নামে সম্মতি প্রস্তাবে। তোদের ছাদে তখন ডানা ছেঁড়া প্রজাপতির মতো পড়ে থাকে ঘুড়ি , অদৃশ্য লাটাইচালক।

মাথামুণ্ডু

মাথাটা পাওয়া যাচ্ছে না। ধড়েরও ছটফটানি নেই। মুশকিল হল মানুষেরা চিনতে পারছে না ধড়টা কার! ছিন্নমস্তার গল্প বলে থেমে গেল কেউ কেউ। ওখানে মাথাটা হাতে আছে বলে। তবে কি কোনো চিত্রকরের কাজ?  মাথা ছাড়া মানুষের কথা বলা। পুকুরে কিম্বা নদীঘাটে নানান মূর্তি বিসর্জন হয়। খড়ের আদলে কেউ কেউ রোদ পোহায়, মুণ্ডুহীন।
 
একদিন ধড়ের হাতে তুলে দিলাম কলম। দেখি দিকে দিকে কনিষ্করা কবিতা লিখছেন অসংখ্য...

জয়ন্ত দত্তের কবিতা

জয়ন্ত দত্তের কবিতা

 

কারখানা-সাইরেন,সরাইখানা ও অন্যান্য

কারখানা আর তার সামনে সরাইখানাটির বন্ধুত্ব অনেক দিনের। একজনের ঘুম ভাঙে কাকডাকা ভোরে।রাতজাগা সরাইখানা সারাটাদিন ঝিমোয়। কারখানার সাইরেনে হুঁশ ফেরে তাঁর। রাত্রির ক্লেদ মুছে নিজের জীবনে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টায় সারাদিন কাটিয়ে... সন্ধ্যেবেলা আবার চুল বাঁধে। খোঁপায় ফুল গুঁজে নকল রানী সাজে সে...

কারখানায় লোহা গলানো হয়। সরাইখানায় মন

 

বাবাকে নিয়ে গল্প  

সকলেরই উচিত তার বাবার গল্প জানা
একদিন খুব করে বায়না ধরেছিলাম
বাবা,তোমার গল্প শুনবো
শৈশব,কৈশোর,যৌবন ও জীবনের গল্প
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা বলেছিলেন
আমার কোনো গল্প নেই
ব্যর্থ মানুষের কোনো গল্প থাকে না
 
বাবার দীর্ঘশ্বাসের চেয়ে দীর্ঘ
কোনো গল্প আজও শোনা হয়নি
এই আফসোস নিয়ে আমিও একদিন
বাবা হয়ে গেলাম...

 

হাসপাতাল করিডোরে

চোখের তারায় দীপ্ত আভা ভরা শান্ত বাস্তুভিটা
অতীতে যাব বলে খুলে নিই নিজেকে
একটু গোছালো সাধারণ নীরবতায়
নেমে আছে আলকাতরার মত কেশ
শ্যাম্পুরা কেমন অস্থির চোখে
নামিয়ে এনেছে সোনালী চাঁদ
 
আমার ভেতর একাদশীর ছায়া দীর্ঘ হয়
আসলে কি ছায়ারা বৃদ্ধ হয়!
শব্দের চেয়ে নৈঃশব্দের তীব্রতা
আমাকে এনে দেয় হাসপাতাল করিডোরে
 
চারিদিকে মেডিসিন কর্নার
ক্লিন প্যাসেজ ও সাদা এপ্রোন
পাটিসাপ্টার মতো কেউ শুয়ে আছে
আর তার হলুদ পা কেমন ঠান্ডা
হিম হিম শিহরণ,শান্ত ফোয়ারা
নেমে আসছে কোথাও...
 

বিসমিল্লাহ-বসন্ত  

উথাল পাথাল
বিসমিল্লা সন্ধ্যায়
উপন্যাস পর্দা টানে
 
প্রতিবিম্ব শামুক হাঁটে
উত্তেজনার আলোক অন্ধে
ধারাপাত ওজন ওঠেনামে
যোগবিয়োগের স্লেটে...
 
ফুলসেতু উঠে এলে
জ্যোৎস্না খসে পড়ে বুকের খোপায়
বসন্তের পাতা পড়ে
গান-গল্প-কবিতায়
 
হাজার অমাবস্যায় তাজ
পূর্ণিমা আনে...
 

 

রোজকার মওত

কেউ না কেউ মরে প্রতিদিন
দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে কিংবা রাস্তায় মাথা কুটে 
সেই মৃত মানুষটি আবার উঠে দাঁড়ায়
মাথা নীচু করে বাড়ি ফেরে
খুব স্বাভাবিক ঘটনা যেন
 
সেদিন হঠাৎ লুকিয়ে লুকিয়ে আমার মরা দেখলাম
দেখলাম থ্যতলানো শরীর পড়ে রয়েছে রাস্তায়
অনেক লোক সেখানে জমা হয়েছে
নিজেদের মধ্যে কথা বলছে
 কারও মুখে ভয়,কারও বা ঘৃণা
 
এ যেন একধরনের খেলা
সকলেরই কোন না কোন দিন এমন হয়ে থাকে
একটা লুকোচুরি খেলার মতন সকলেই নিজের মৃত্যু দেখে 
শব দেখে
আমার মতই লুকিয়ে দেখে
 
তারপর ভাঙাচোরা হাত,পা ও থ্যতলানো মুখ নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়
অবশেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়...

বিকেল-ব্যালকনিতে বৃষ্টির রিংটোন

যতবার মেঘ করে আসে
বৃষ্টিফোঁটা গায়ে পড়ার আগেই ফোন আসে
কোথায় তুমি!চেয়ে দ্যাখো বৃষ্টি হচ্ছে...তোমার বৃষ্টি
আমি বৃষ্টি দেখি আর ভাবতে থাকি
মেয়েটা কি সত্যিই পাগল!
 
কথার ছলে একবার মাত্র বলেছিলাম
আমি বৃষ্টি ভালবাসি...খুব ভালবাসি
তারপর থেকেই নিয়মিত ফোন
ওপাশ থেকে সেই চিরপরিচিত কণ্ঠস্বর
কোথায় তুমি!দ্যাখো বৃষ্টি আসছে...তোমার বৃষ্টি
অবাক হই বরাবরের মতো --এ যেন বৃষ্টিকেই বলা
তুমি ফিরে এসো বারেবারে.. .
 
মেয়েটা শুধু জেনে গেল আমার ভাললাগার কথা
কেবল অজানা রয়ে গেল
আজকাল বৃষ্টি এলে ঘরের দরজা জানালা
বন্ধ রাখি আমি...
 

অনন্যা, শুধু তোমার জন্য 

যতগুলো রাত অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায় নিদ্রাহীন ছিলে
গুনে গুনে ঠিক ততোগুলো নক্ষত্রের বুকে লেখা হয়েছে
তোমার আত্মকথন
 
ঠিক যেদিন আকাশ আসমানী নীল থেকে
আস্তে আস্তে গাঢ় নীলে পরিণত হয়েছে
আমি যতবার আর্তনাদ করেছি
ঠিক ততবার তোমার কান্না ভেসে এসেছে 
আমার উঠোনে...
 
তোমার কারণে যতগুলো সাগর মরুদ্যান হয়েছে
আমার অপেক্ষায় ঠিক ততগুলো মরুদ্যান সাগরে পরিণত হয়েছে
 
তোমাকে ভালো না বাসলে বুঝতেই পারতাম না
পৃথিবীর বুকে এখনো অলৌকিক কিছু আছে


শৈশবের সলতে 

হারিকেন-এর মধ্যে সলতে আর কেরোসিন এর প্রেমে আগুন জ্বলছে। আমি সেই আগুনের আলোয় অঙ্ক করতে বসেছি। ক্লাস ফোর। ল.সা.গু. আর গ.সা.গু.। ৮,১০,১২,১৫ এবং ২০ এর ল.সা.গু. বের করলাম ১৮০। বাবা পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেনমন দিয়ে অঙ্ক করো। রেজাল্ট ১৮০ না, ১২০ হবে

১৮০ কেটে ১২০ লিখতে লিখতে তাকিয়ে দেখি,শৈশবের সলতে বয়সের কেরোসিনে ডুবে গেল

 

লাইক

কে কে বুড়ো আঙুল ছোঁয়ালো...
সকাল-দুপুর-রাত্রি ছুঁয়ে যায় চোখ চেনা অচেনার মুখে মুখে!
 
ছবিও লেখার গুরুত্ব গর্বে হৃদয় সিঁড়ি বায় থেকে থেকে...
 
নানা রঙের ফুল ফোটে বাগান ভর্তি মনে
মৌমাছির গান বেরিয়ে আসে অন্তরনির্যাস হৃদয় পাঁজর ভেঙে...
 
লাইকই ভেঙে দেয় যত সব
পথ
কালবৌশাখি পথের উত্তরণে
 
 
ভালবাসা যখন শিকারি 

ভালবাসা কখনো ভীষণ তুখোড় একগুঁয়ে। জেদি  অব্যর্থ এক শিকারি যেন! সে একটি বাঘকে ফাঁদে ফেলে মারবার জন্য একটি ছাগল ছানাকে গাছের তলায় বেঁধে রাখে। আর বাঘও শিকারের ডাক শুনে গন্ধে গন্ধে,পা টিপে  এগিয়ে আসে। খানিক চেয়ে দেখে। দেখতে দেখতে খেলতে আরম্ভ করে। একটু খেলা না হলে ভালবাসা ঠিক জমে না। অর্থাৎ পা টিপে টিপে একটু কাছে যাওয়া। আবার পিছিয়ে আসা। প্রদক্ষিণ করা। প্রদক্ষিণ করতে করতে দূরত্বটাকে কমিয়ে নিয়ে আসা। ওত পাতা এবং তারপর এক লাফ। ওদিকে  ভালবাসাও সুযোগ বুঝে বন্দুক তাক  করে দাঁড়িয়ে। তাই লাফ দেওয়ার সাথে সাথেই শেষ...

 


শীলা বিশ্বাসের গুচ্ছ কবিতা

শীলা বিশ্বাসের গুচ্ছ কবিতা

 

ত্রিস্তনী


গ্যালাক্সি পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে অতীত। জন্ম, আকাঙ্খা আর মুক্তি। দৃশ্যগুলি

খোলসশরীর ঝলকিয়ে বাঁশি বাজায়। সেই সব দৃশ্যে রাত পোশাক খুলে ফেলছে

ত্রিস্তনী মেয়েরা। চাঁদের আলোয় ডুবকি আর চুলের ধারা বেয়ে সুগন্ধী। পুং দণ্ড

ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়ালসিল্যুয়েট সাজিয়ে রাখছে পর্দা

 

দৃশ্য ভাঙানিয়া প্রথম স্তন সন্তানের ঠোঁটের ফাঁকে ঘুম গুঁজে রাখে । দ্বিতীয়

স্তন প্রেমিকের মুখে; লীনসঙ্গম কাঠবিড়ালি ঢেউ আর উরুর ফাঁকে সম্ভ্রমদেশ

আরামপুরী। নাভি জুড়ে লালতিল আরতি করে স্পর্শপাখিরা। তৃতীয় স্তন ক্ষমতার

দণ্ড। শক্তিমুগুর খসে পড়ে তাঁহার দেখা পেলে। মাটির যোনি বেয়ে নরম ঘাসের

রতিস্পর্শ, জলের নিক্কণ

 

ধরা দিলেও সে দৃশ্য ছেড়ে দিতে হয়। ডুবে যায় অন্ধকারের ভিয়েন। যুদ্ধ–শাসন-

বীর্যের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে আসে বিষ আর ঘৃণায়। চুল্লীর হাসিতে আহবান।

নাম নিজের সৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলে পুরাণলেখর শৃঙ্গারে নারী দেবী হয়ে

ওঠেন

 

 

চীবরকথা

 

সে এক সন্ধ্যায় তন্তু ও নৈঃশব্দ এক হয়েছিল

ভিক্ষাপাত্রের পাশে রংহীন জীবনের সামান্যতা

তৃণ লতাপাতা বাকল নিয়ে রৌদ্রবৃষ্টিস্নাত

প্রবহমান যশোধরা

পর্দা কী হাওয়ায় উড়েছিল সিদ্ধার্থ?

ফেলে যাওয়া সংসারের ছায়া কি তোমাকেও ঢাকেনি!

কোন আর্যপথ তোমার? কোন পথে গেঁথেছিলাম ত্যাগ?

দেখো গৃহ ও সন্ন্যাসে একই চাঁদ লেগে আছে

 

হৃদয়চিহ্ন আঁকা বোধিবৃক্ষের পাতায়

মায়া ছড়ানো সুজাতার মৃদু জোনাকিহাসি

চামচ থেকে গড়িয়ে নামা শিশির বোধি

শরীরমুখী সিদ্ধার্থের উপবাস ভঙ্গের মোহনভাত

দুগ্ধ চাল জলের অনুপাতে নয়রাত্রি রন্ধন

তন্ত্রমন্ত্র নয়, প্রেমসূত্রের তৈজসে

দেবীর অবশেষ

 

 

যুদ্ধ জার্নাল

 

হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্।

তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ॥

 

যুদ্ধের প্রথম দিনে লক্ষ্য ছিল অসাধারণ

দ্বিতীয় দিন লুকানো বাঙ্কার আক্রমণ

বরফে জমে যাওয়া লক্ষ্যভ্রষ্টগুলি তৃতীয় দিনের ছবি

মৃতদের ছায়া বড় হতে লাগল চতুর্থ দিন

তাপাঙ্কের নীচে বন্দুকের নল পেঁচিয়ে…

স্তব্ধ সেনাদের হাত

 

 

সেনাপ্রধান টুপি খুলে অভিবাদন জানাচ্ছেন—

তবুও কেউ বন্দুক নামায়নি

ধোঁয়ার ফাঁকে এক টুকরো নীল আকাশ ভীত, সন্ত্রস্ত

বাসি ফ্যাকাসে চাঁদ গিলে নিচ্ছে কঙ্কালসার সৈন্য

চিত্রকর একমনে এঁকে চলেছেন আহত সৈনিকদের

 

দৃশ্য আর ছবির ব্যবধানে মৃতরা হারিয়ে যায়

 

যুদ্ধবিরতিতে কার্তুজের খেলা দেখানো অপরাধ

 

গাছের ছায়ায় সেনারা লুকিয়ে

আহত সৈনিকের পোশাক ও অস্ত্র নিরুদ্দেশ

ডানা ভাঙা হেলিকপ্টার —

শত্রুপক্ষের পতাকা ঝুলছে ভাঙা জানালায়

 

চারদিকে ধোঁয়া, বারুদ গন্ধ

 

 

চলন্ত হাসপাতাল এগিয়ে আসছে

ক্ষতস্থানে সেবিকা ব্যান্ডেজ বেঁধে চলে গেলে

তুলোর বৈধব্য মুছে যায়

লাল যোগচিহ্নের উপর

স্নেহ ডাক অনুমোদনহীন বেজে গেল

 

কাঠের পা মালিকের অপেক্ষায় দৃষ্টি ওড়ায়

 

 

একা সৈনিক বিপক্ষ শিবিরে

হাঁটু গেড়ে বসে, আলোর খোঁজে মুখ

রোদটা এখনও পড়ে আছে ঘাসের মাথায়

বেঁচে থাকার আশ্চর্য নিয়ে জীবন চলেছে

একটি যুদ্ধ থেকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে

 

একটি আশ্চর্যের থেকে আরেকটি আশ্চর্যের দিকে

শতাব্দী চক্রবর্তীর দশটি কবিতা

শতাব্দী চক্রবর্তীর দশটি কবিতা


নথ

এক শীতকালে তুমি সবুজ শরীরে 

কুয়াশার নথ পরিয়ে 

চেখে ছিলে বৃক্ষের কোটর, ঝুরি, মূল 

শীত শেষে সেই সব ছায়ারা 

সবুজ থেকে হলুদ হয়ে ছোট হয়

রোদ বাড়লে তোমার নতুন ডানা গজায়

নথ খসে পড়ে শূর্পনখার

স্বয়ম্বর আয়োজন । 

অনুপস্থিতি

শূন্য কাগজের জাহাজ

হাওয়া ভরা মেঘে পুড়েছে মোহ, 

বেড়েছে ময়াল খিদে

জান্তব থাবায়। 

এখন প্রতিটি রোদের কণায় 

শীতকাল যত্ন দেয় খুব

তরতাজা ক্রীম নতুন ত্বকের ওপর

ব্ল্যাকহোল বন্ধ করে। 



পাখিজন্ম

ক্ষেত শূন্য হয়, 

বুক থেকে কেটে নেয় তার ধন

গৃহস্থের উঠোনে বসে লক্ষ্মী

নবান্ন গন্ধে আকাশ থমকে পূর্ণিমায়

পরিযায়ী ফিরে আসে পৌষের ঘরে ঘরে। 



প্রজাপতি দেখা ছোট্ট মেয়েটি

নয়নে ভ্রমর সাজিয়ে,

পদ্মপাতায় ফড়িংয়ের হাসি মেখে

‘ঐ তো বাবা!’ ডেকে ওঠে

আনন্দে মেয়েটির পাখিজন্ম। 



উপকথা

শিবকে ঠাণ্ডা করতে হয়

জল দুধ ঢেলে ঢেলে বেলপাতা ধুতুরা আকন্দে

ঘি মাখিয়ে মসৃণ করতে হয়

কত রাতে ঘিয়ের গন্ধ পাই

কত রাতে দুধের ওল্টানো বাটি 

কত রাতে ধুতুরার বিষ নিয়ে

তৃতীয় নয়ন খুলে রাখি। 

শিবের রাগেই সৃষ্টি হয় খণ্ড খণ্ড শিব

তাণ্ডবে আমি উজলা হই

রাগ কমে গেলে 

ভীষণ রকম ঠাণ্ডা হয়ে যায় লিঙ্গ

শিব তখন খেলার পুতুল হয়ে ওঠে মেয়েলি হাতে



নৌকা

  

জল ভাগ করে নৌকা এগিয়ে আসছে

অপেক্ষা দাঁড়িয়ে থাকে পাড়ে

উতলা বুকের ভেতর টুকরো হতে থাকে খেদ

সমস্ত দেনা পাওনা মিটিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। 

গন্ধের ভেতর লবণ লুকিয়ে ছিল এতদিন

এবার রান্না হবে, সুস্বাদু আহার, পুরুষের ঘ্রাণ! 



নৌকার হারানো হাল বয়ে আনছে বছরভরের কামাই

এবার বুকে এসে নোঙর করুক সেবাদাস

কাজলের ছায়া একাই টেনে নিয়েছে চোখে

যেভাবে জল ভাগ করে নৌকা আসছে

সেভাবেই দুই পায়ের ভাগে।



মরণের ওপার হতে

একটি দৃশ্যই বারবার দৃশ্যমান ঐ হাওয়ায়

চমৎকার ছবির মতো ফুটে উঠবে আমাদের ভ্রমণ। 

এমন তো কথা ছিল না শ্যাম

ভ্রমণক্ষেত্র বধ্যভূমি হয়ে যাবে? 

হাত থেকে খসে পড়বে কামড়ে খাওয়া শেষ আপেল

চোখ থেকে মুছে যাবে সবুজ দৃষ্টি! 

আমাদের বয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পরিজনের কাছে

একটি সুখের ছবিই উল্টে পাল্টে দেখে যাবে

একমাত্র জীবিত সন্তানেরা। 

দূরের পাইন ফরেস্টের বুনো গন্ধ তখনও ছড়াবে

তখনও জলের প্রপাত হাহাকার করে 

ডেকে যাবে আমাদের অস্থিতে, 

মজ্জায় রেখে যাবে শেষ হাসির খেয়া। 

ওরা মারল আমরা বেঘোরে মরলাম

আমরা শহিদ নই, আমরা যুদ্ধ করিনি

আমরা ভ্রমণে বেরিয়ে বুলেট খেয়েছি দামামায়

তার পরেও নীতিহীন পেশাদারিত্ব দিয়ে কী সুন্দর 

আমরা মুড়ে ফেলতে পেরেছি নগর জীবনকে! 

আমাদের ভ্রমণ সাঙ্গ হবে না কোনোদিন

বরফ জমা মুখে লেগে আছে অতৃপ্ত শেষ চুম্বন। 



যাজ্ঞসেনী


কীভাবে দুঃখ মোছাব তোমার! 

শুধু চিৎ হয়ে ভেসে থেকেছি তোমার নাওয়ে

সেখানে দুঃখ দেখিনি কোনোদিন। 

ওরা সাঁকো ভেঙে দিল আমাদের ধর্ম চিহ্নে

ভাষার দোহাই দিয়ে ঢেকে দিল সংস্কৃতি। 

বিবেক ধ্বংস হয়ে গেলে

ধ্বজা ভেঙে যায় চৈতন্যের

কাদা পাঁকের কীট হয়ে আয়ু খায় তখন মুরুব্বি

ঈশ্বরকে পেড়ে এনে বিধান দেয়

পাঁজরে অস্পৃশ্যতার বাটখারা বসায়। 

কীভাবে আর দুঃখ মোছাব তোমার? 

তোমার অশ্রু আমারই রক্ত

ওরা ভেঙে দিল বুক, ডানা, 

পাখিরাও জানে মরার আভাস লুকানো থাকে ব্যথায়

কঠিন টুকরো বরফের হাওয়ায় ভাসে দুঃখের পালক। 

যেকোনো ছলেই ওরা আমাদের ভেঙে দেয় 

কৌরব সভাতেও দুই হাত দিয়ে ঢাকতে হয়েছে

এক কাপড়ে রক্তময় শরীর। 

মাধবের দয়া মনের ক্ষত ঢাকতে পারেনি

ফাটা বুকে খুঁজে চলেছি নিরাময় এই কালেও



বেহুলার নৃত্য

নদীর ধারে নেতা ধোপানী বসে আছে

গুচ্ছের কাপড় নাইবার কালে কেচে নিতে। 

এক মর্ত্যবাসিনী বংশের মান রাখতে এই পথেই আসবে

নিজের স্থল হারিয়ে দুঃখ ভাসিয়েছে যে জলে

তার জন্য স্বর্গের পথ দেখাতে ধোপানী বসে আছে

স্বর্গের খোঁজে ভেলা ভাসানোই যে বেনেবৌয়ের বিধি। 



পায়ের ঘুঙুর বেজে ওঠে স্বামীর শরীরের বিনিময়ে

দেবতাদের রসে মজিয়ে দিতে নববধূর লজ্জা ছেড়ে

শব ও সন্ন্যাসীর আদালতে জীবিত বেহুলার স্বর্গ যাত্রা

সদ্য প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের জন্য নিজের আত্মাহুতি, 

অনন্য প্রমাণ করতে উল্লসিত হাত কেড়েছে তার আব্রু। 

চাঁদ বেনের বংশ রক্ষায় একা বেহুলাই স্বর্গে গেল! 

স্বর্গে যাওয়াতেই তার সতীত্ব! 

এরপর অমাময় চাঁদের কলঙ্কিত পাহাড়গুলি 

কেমন করে তার কচি বুকে এসে ফুল হয়ে যাবে? 

ঝরনার জল কি স্বর্গে উঠে গেলে বরফ হয়ে যায়! 



মেঘলা দিন

মেঘ করে এলো শহরের ব্যস্ততম সময়ে

ওদিকে প্রেম জমে গড়ের মাঠ, পার্ক স্ট্রিট

আর এঁদোগলিতে জামা-খোলা মুখ

আকাশ ভেঙে থৈ থৈ আঁধার চোখ। 

চোখে জল, জলে চোখ মিশে যাচ্ছে

অলেখা চিঠিতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে মেঘের ভুল

দুঃখ বিষ বৃষ্টি ভাগাভাগি শোকে

জেগে আছে বুক

বুকে জেগে আছে তৃষ্ণা ।

নির্জন হতে সমুদ্রে চলে যাবে বলেছিলে 

ঘন প্রহর, বালি, রিসোর্ট, সুইমিং, লবণ স্নান পেরিয়ে

আমার দৃষ্টি কেবল অসহায় মুখের দিকেই!

অবাক হও! দোহাই নম্র বুকে এনো না অন্ধ আঘাত

এমনই বাউন্ডুলে শর গাঁথা ভীষ্মের শয্যায়

ভারী গর্জন তুলে ভেঙে দেয় আমার সব বিপন্নতাই

মুহূর্তে ছাই হয় আগুন। 

মায়ের কথা


১.

লাল জন্মের দাগ বয়ে বেড়ায় ভাদ্র কুকুর

কানীন শরীরের ঘেউ ঘেউ আপত্তি 

কেউ বোঝে না! 

দগদগে ঘা নিয়ে গুটিয়ে যায় 

শিশুদের ঘ্রাণের ভেতর

পরাজিত লীলা সেজে ওঠে পথে পথে

চক্রব্যূহ জন্মের শোধ। 

২.

হাড়ের কাঠি ভেঙে উনুন জ্বালিয়ে

রোগা হাতদুটো রেঁধে বেড়ে চলে

জ্যোৎস্না, চাঁদ, সানস্ক্রিন, ওষ্ঠরঞ্জনী

এসব ছলনা মাত্র অদরকারীও বটে। 

শালবনের ঝাটি বাঁধে মাথায় 

যদি শূন্য আকাশে শিকার খোঁজে চিল

মাতৃশরীর নিজেকে এগিয়ে দেয়। 

কখনো দুর্বল হতে নেই মায়েদের 

রক্তে অসীম শেকড়, অনন্ত স্রোত, অটল স্থাপন

খণ্ড খণ্ড দেহ কেবল ভাসমান প্রতিফলন। 

ঝিলপাড়, দুঃখজাগানিয়া লাটাই

আমিও বৃক্ষ দেশের শেষ ফুল তাই। 

দশটি কবিতা : ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়

 দশটি কবিতা : ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়

 

রাগদেশ
 
আকাশের মতো নীলে নদী বেঁধে দেখিনি কখনও
প্রচণ্ড জলের তোড়ে কীভাবে ভাসন্ত ধুলোঝড়
বুঝিনি, কেন যে এত কথালীন কাছাকাছি এলে
থেমে যায় অসম্ভব বিকেলের গল্প পরস্পর
 
বিকেলের কথাবার্তা আলো ও ছায়ার পাশে হাঁটে
নদীতীর বসে নেয়, অবিশ্রাম জললতাঘ্রাণ
সন্ধে হয়, ছায়া থেকে আলো-তাপ ছেঁকে নিয়ে মনে
ঘরে ফেরে, সারারাত ধরে চলে উজ্জ্বলতা-স্নান
 
স্নানের পরেই জানি পাওয়া যায় অনিবার্য মন
হৃদয়ে হৃদয় মিশে মন্থনের নীলঅকারণ
কারণের শেষে বসি, থেমে যাই, চলাটিও শেষ
শেষের শেষেই ওড়ে চলনের বিরহ-নির্জন
 
নির্জনও বিরহময় বড় বেশি একাকিত্ব-জ্বর
উত্তাপের ঢল বেয়ে ধেয়ে আসে মগ্নতা আভূমি
বোধেরও অতীত বোধে ডুবে যাই আশিরনখর
চেতনার জটে তবু জেগে থাক অচেতন-ধুন
 
প্রতিটা গল্পেই কিছু মোড় ও মুহূর্ত আনাগোনা
অবশেষ রেখে যায় রাগদেশে বৃষ্টি ও রোদ্দুর
অনুরাগ আসে তার পিছু-পিছু অনুভূতিরঙা
দুজনের মধ্যে রাখে একটিমাত্র রঙের ঘুঙুর
 
ঘুঙুরেও রং বাজে, বেজে যায় দুজনের ফাঁকে
দুজনের পথ তাই ক্রমাগত দুটি দিকে বাঁকে... 
 
  
তারের মোচড়ে ওড়ে ভাঁজ
  
একটা রোদ-ঝকঝকে সবুজ ওড়না মেলে ছেয়ে আছে পথে
আমিগুটিসুটি বসি রোদের ভেতরে, 
কী যে হলুদরঙের গাছ! ডালে ডালে রঙিন পাখির   
লাল ঠোঁট, গুঁড়িগুঁড়ি চেরিফল
আমিও তো উবু হয়ে সবুজ রঙের কুর্তির গা-থেকে তুলি নুড়ি,
লালরঙা মাটির কিছু স্মৃতি, গভীর এঁটেল 
হাতে-মুখে লেপটে থাকে শুকনো আঠার সাদাটে দাগ   
রোজ একা হলে সেই দাগে বাজে     
মিলন-পারের দীর্ঘশ্বাস
 
মনের ভেতরে থাকা ঝড় খায় পাক 
ভায়োলিনে এসে বসেন নিকোলো প্যাগানিনি
তারের মোচড়ে ভাঁজ খুলে ওড়ে কত সবুজ রঙের জামা 
কানের দুলের মুক্তো খসে গেলে ফোঁকরের ধুলো থেকে উঠে আসে
সেইসব বিচ্ছেদের ফাঁকা মাঠ
আলের উপর অগোছালো বট
পাতার ঝাঁপিটি এসে গায় বন্ধন-মুক্তির গান   
কবেকার বাক্সে থাকা সোঁদাগন্ধী উড়ন্ত জামারা
তখন দিগন্তে, নীল নয়
মাথার ওপর উড়তে থাকা সবুজ-রঙিন এক নিজস্ব আকাশ...
 
 
আগুনবটের চারা
 
সুর ভুলে যাওয়া বাউলের একতারা
অগোছালো এক দিনের আড়ালে হাঁটে
হারানো সুরের ব্যথা লেগে জ্বলে তারা
পাওয়া না-পাওয়ার পথ থেমে আছে মাঠে
 
সে-সব দহনে ধিকি-ধিকি বেঁচে থাকা
গুছিয়ে রেখেছে চেনা করোটির মালা
মানে-অপমানে মৃতআগ্নেয়বোধে
চাপা পড়ে গেছে বাউলের আটচালা
 
ভাবনা তবুও চলেছে দূরের পথে
হেঁটে হেঁটে খোঁজে নিভৃতির কোনও দেশ
জ্বলন্ত সেই একাকীর সন্ধানে
বন্ধুর হাত হয়েছে কি নিঃশেষ ?
 
দেহ-মন জুড়ে আগুন-বটের চারা
জড়িয়ে উঠেছে ক্রমশ মাথায় শিখা
জ্বালানি ফুরোলে নিজেরই পাই না সাড়া
মৃতদেহ জুড়ে দাহটির জয়টিকা
 
উত্তাপে পোড়া ছন্দটি ক’রে আলো
করোটি-জীবন খোঁজে কবিতায় প্রাণ
আমরা এখনও সুরভোলা গৃহপাখি
প্রতি বন্ধনে গাই বাউলানি-গান... 
 
 
 
চড়াই
 
ভাসানে প্রতিমা গেলে খড়টুকু ভেসে থাকে জলে
ভাসন্ত খড়ের পাশে ফোটে শালুকের ফুল
গোল গোল পাতা জুড়ে
জলপিপির অনিবার্য হাঁটা-চলা
আশ্চর্য গোলাপি আভা
সরোবর ছেড়ে ওড়ে
             স্মৃতি গুঁড়ো গুঁড়ো
ঊর্ধ্বমুখী আলোর মায়ায় ঘেরা ঘোর
জীবনের গায়ে পড়া ঢাকের কাঠিরা
 
দু’চারটে পাপড়ি তুলে পরে নিই চুলে
পদ্মবীজ-কথামালা গলায়, বাহুতে
শ্রীমৎস্যকন্যার মতো মনে হয়
লীলায়িত সংসারের খুঁট খুলে
সর্বাঙ্গে জড়াই
 
এতটা আনন্দ এলে দুঃখ শুধু কুটোখড়
                আর কিছু
              উড়ন্ত চড়াই...
 
 
একটা সিঁড়ি ও আশ্চর্য বালতি 
 
মনের ভেতর একটা সিঁড়ি
ধাপে ধাপে সুখ-দুঃখ-কান্না
আশ্ঢর্য বালতি করে ওঠে আর নামে
ব্যথার রাতের শেষে সূর্য উঠলে 
কোনও দিন রাত ছিল মনেই হয় না
 
ফেলে আসা মহুয়ার ফল
মুচকুন্দ গাছের সারি, সুরকি ফেলা লাল পথ
তোমাদের আসা
যত না থাকার গান
শূন্যতারা বাজে আরও বেশি
শুধুমাত্র ছুটোছুটি এ-তীর ও-তীর,
স্পর্শ ওড়ে, ধরা তো যায় না
 
গন্ধটুকু ধরে নিয়ে রুমালের কোণে
আঁকি সামান্য গোলাপ
বাগান-বিলাস থেকে পাপড়ি তুলে দিই গেঁথে
সুচের ফোঁড়ের সঙ্গে গোটা পথ অপেক্ষার
 
নদীতীরে অবিশ্রান্ত স্নান সেরে ঘরে যাই আমরা
পাখিরাও ফেরে আর ফেরে দলে দলে
লাল-নীল ডানাদের পালকেরা ভাসে
 
সিঁড়িটির ধাপ ঘোরে
প্রচণ্ড ঘর্ষণে তাপ মেঘ হয়
প্রতিবার শ্রাবণ-বিকেলে বৃষ্টি হলে
ধুলো ধুলো স্মৃতি ঝরে 
 
সবুজ কাচের চুড়ি, ওড়না-বাঁধনে টিপ, কাজললতা
তোর সঙ্গে কাটানো বিকেল, দামোদর নদ
মেঘবৃষ্টির তোড়ে কিছুই আলাদা করে চেনা তো যায় না...  
 
 
 মা-টি
 
গর্ভের মধ্যেও থাকে এক নৌকো
মাস্তুলে ঝুলন্ত চাঁদ, চাঁদের ঝরনায়
জল থাকে, ঝরে যায় নির্দিষ্ট ধারায়
বীজ এলে আবর্তন বাড়ে, চাকার শিরায়
 
ক্রমে বেড়ে ওঠে ঘাস নরমসবুজ
মা বোঝে প্রথম শ্বাস, নড়াচড়া-স্পর্শ
শরীরে বীজের দুধ উথ্‌লে ঝরনা-জলে  
পাশ ফিরে সাড়া দেয়, নৌকার শাবক
 
এত কিছু জেনে গেলে মেয়ে মা-টি হয়
হাতে মুখে মেখে নেয় ধুলোর সময়...
  
 

শঙ্খচিলের মা 
 
মনের ভেতর একটা ঝিল
সবুজ জলের মধ্যে কচুরিপানার ফুল
আহা!
বেগুনি রঙের আভা আজও
ঝিলের দু’পাড় ঘেঁষে ঝুমকো জবা
সারি সারি নারকেল গাছ
ভোরবেলা হলে দিদা হেঁটে যান সাজি হাতে
 
নারকেল গাছের মাথা পাক খায় চক্রাকারে
ঝড় এসে ডানা মেলে বসে পড়ে বাসার ওপরে
চামচিকে ও দুটো সাপ দেখে সেই সব
ডিমে তা দিয়েই যায় শঙ্খচিলের মা
 
দিদা এত কিছু না বুঝেই ঢুকে যান ঘরে
 
মাথার ওপরে চক্রাকারে মার
আর সুখ মুখোমুখি
জিততেই হবে
পিঠের দাগের কাছে নত হলে মৃত্যু...
 
খুব বেশি দূরে নয় সমুদ্রের ঘ্রাণ
অনন্য নদীর পার, কয়েকটি অখণ্ড মাঠ 
পেরোলেই নোনা ছাট মুখে এসে লাগে
ভেতরে উড়ন্ত কিছু বিরহ-বিশ্বাস
আমার কন্ঠেও লাগে বিন্দু বিন্দু ঘাম
 
কথা বলি,
নিজেই নিজের কাছে একা
সমুদ্র-শঙ্খেরা বাজে শিরা-ধমনীতে
প্রাকৃতিক প্রেমে জমে দিন-রাত, রাতের পাথর
জল ঝরে,
রক্তের সামান্য বিপরীতে
 
ঝরে যাওয়া জীবনের রীতি
বালি ঝরে, লেগে থাকে নোনা শ্বাস
সমুদ্রও ঝাউপথে হেঁটে যায়
আমরাও
মা-বাবার হাত থেকে প্রেমের হাতের ছায়া ধরে
          সন্তানের বাহুতে জিরোই...
 
জীবন চলার পথ সোজা যায় সুগন্ধি টিলায়
বলাটি সহজ কিন্তু পথ কিছু বাঁকা
কাঁটা আছে, ইতস্তত মারের চাবুক
পলাশ-চোখের দুঃখ আঁকা সেখানেও
 
গাছপালা সোজা সোজা, তেমন জঙ্গল সে তো নয়
মাঠের সবুজ ঘাস পুড়ে খড়
মাঝে ক’টি খেজুরের ঝাড়
দূর থেকে মাথা নাড়ে
মনে হয় হাত ঝেড়ে উঠে পড়ি
সন্ধ্যা টেনে বসাই সম্মুখে
প্রচণ্ড নীলের মধ্যে দুঃখ ডুবে যাক
সহজ তো নয় সেই সুখের সন্ধান
নিজস্ব মাপের গোলাকার
পুরনো-নতুন ওড়ে, খায় পাক
বসে পড়ে
পাশের জমিতে চক্রবৎ অনাবিল
 
নারকেল গাছের মাথা ঝড়ে নুয়ে পড়ে
বাসাকে সূর্যের মতো ভেবে নিয়ে আজীবন ঘোরে শঙ্খচিল...    


 
পৃথিবীর ঢাল বেয়ে চলা, আজন্ম অভ্যাস মনোমতো হওয়া সময়ের
কার যে কথায়, কার জন্য, অন্যের সমুদ্র থেকে ঢেউ-শব্দ-গন্ধ
তুলে জলজ প্রাণীর মতো বাঁচা, মাথা নিচু,
যদি হতে পারো পুতুল বা মৎস্যকন্যা, নীল চোখ, সামান্য মনের
 
পুতুল-সংসারে থাকতে থাকতে সন্তানবতী হলে বাজে গান  
উৎসবের গ্লাসে উথলে ওঠে সুধা, বীজের শিশু থেকে গাছ
তাদের শিকড় ধরে হাঁটতে বেরোন বসুধা
 
হোক গর্ভপাত, হোক না ধর্ষণ, চিৎকার নয়, চুপ
চিৎকার নয়, লক্ষ্মীমেয়ে, দেওয়ালেরও কান আছে,
সুতরাং আরও ধীরে, আরো মৃদু সুর
মরে গেলে ক্ষতি নেই, কেন্নোদের বংশবৃদ্ধি প্রচুর
 
কথা নেই, কান বন্ধ, কানের মধ্যে মাছির ভনভন
শুধুমাত্র অভ্যাসবশে কাপড়ের আঁচল জড়িয়ে রান্না থেকে স্কুল
মাথাভর্তি বৃষ্টি-বাদলা নিয়ে বারংবার দৃষ্টিহীন ফিরে আসা  
হাত ভোঁতা, পা-দুটি লতপত করে জলে 
অফিস ফেরত রং ধাক্কা দিয়ে সেই কবে গেছে চলে
 
আর নয়, পারা যাচ্ছে না এইভাবে, চাকায় সুতোর মতো জড়িয়ে জড়িয়ে বাঁচা
আটপৌরে সুতির শাড়ি মাঝে মাঝে ছেঁড়া, ইঁদুরেরা গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে পৌঁছে গেছে বনে,
মানুষেরা নেই। কয়েকটি টিলার পরে হয়তো কিছু ফাঁকা, আলোকণা
তারপরেও হাঁটতে থাকলে পাওয়া যেতে পারে আশ্চর্য বাগান, কল্পবৃক্ষ, ঝরনা…