লাকী চট্টরাজ - এর কবিতা

লাকী চট্টরাজ - এর কবিতা

 

তুমি তো দেখো না

হেমন্তে ছাতিম সন্ধ্যা বড়ো মায়াময় 
চাঁদের আলোয় 
তুমি তো দেখো না এইসব,
নিস্তব্ধ দুপুরে কামিনী রায় আর দিন চলে যায়’’
এর মাঝে ক্ষণিকের মগ্নতা তোমার ভালো লাগেনি,
বোঝনি সুখ কী, স্বস্তির নিঃশ্বাসই বা কী!
তুমি তো বোঝো না সেইসব,
সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল, 
বলেছিলাম চলো দুজনে একসাথে গাই,
শোননি সেদিন, অবাস্তবের  পাহাড় ভেবেছিলে;
অথচ সেটিই ছিল আমার পরিণত ভালোবাসা 
আজো আমি গান গাই, কবিতায় ডুবে যাই, বৃষ্টি দেখি,
ছাতিম গন্ধে বিভোর হই, 
আর আকাশ দেখি পূর্ণিমা রাতে...


অন্য হেমন্ত 


ভেবেছিলাম হেমন্তের একটি সন্ধ্যায় 
আমার কবিতার জন্য হিমঝুরি হয়ে আসবে,
ছাতিমের গন্ধ হয়ে আসবে 
তুমি এলে কই?
আমি একা একা হেমন্তের বিকেলে পড়ন্ত রোদের গল্প শুনলাম, আকাশের বুকের ওপর শুয়ে থাকা ক্ষীণ আলোয় মন ডোবালাম
তুমি এলে কই ? 
ইচ্ছে ছিল ঐ কমলা আভা মেখে , কল্পনার নদীঘাটে কাটিয়ে দেবো  তোমার কণ্ঠে ধায় যেনো মোর সকল ভালোবাসা শুনতে শুনতে 
তুমি এলে কই?
তোমার অনুপস্থিতি আর পার্থিব নৈঃশব্দ্য 
বড়ো বাঙ্ময়, অন্য হেমন্ত, কবিতার কাছাকাছি.....

 

দৌড় 

স্মৃতির পথে হাঁটতে গিয়ে দেখি 
আমার শৈশব আসর ছোঁওয়া শপথের আহবানে 
সাতগুঠি আর বুড়ি বসন্তে,চু কিতকিত, লুকোচুরিতে 
আমার শৈশবটা ছিল লেবু দৌড়, বস্তা দৌড়, অঙ্ক দৌড়ে 
দৌড়েছি মিটারে, কিলোমিটারে,
এখনো দৌড় আছে, সন্তানের জন্য অভিভাবকদের 
ইঁদুর দৌড়,একে অপরকে ঠেলে
পালিয়ে যাওয়ার দৌড়,
আমাদের ছিল শৈশবের বিকেল আর সবুজ মাঠ
বাস্তবে ফিরে দেখি
বিপন্ন শৈশবে আমার দীর্ঘশ্বাস
আমরা পারিনি শিশুদের বন্ধু বৃত্ত তৈরি করতে
শুধু ওদের সরল জীবনকে করেছি জটিল,
শরীর আর মনের স্বাস্থ্য গঠনের দৌড় আর
পৃথিবীকে সবুজ দেখার দৌড় থেকে
বঞ্চিত করে, সবুজ শৈশব কেড়ে নিয়ে....

 

সময়ের ছাপ

কুঁড়ি থেকে প্রস্ফুটিত গোলাপ
শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি 
সময় শুধুই ফেলে যায় তার ছাপ...
দারুণ দহনবেলা থেকে কৃষ্ণচূড়ার কলি আসা
সময় করেছে বন্দি, আমরা তার সাক্ষী
বর্ষার মেঘে সময় এঁকে চলে একলা ঘাটের
তরী ভাসানোর গল্প, কখনোবা কলাভবনের ভাস্কর্য
সময়ের বুকে সোনালী ধান করে কলরব,
ঝরাপাতারা শুভেচ্ছা জানায়, মাঠের বাঁশি শুনতে শুনতে
উৎসবের আয়োজন সেরে ফেলে..
হৃদয়ের বসন্ত আসে একতারাটির তারে
দূর থেকে ভেসে আসা সুরে মন ভাসাই..
আমার ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো” ….


আলো দৃষ্টি 
 
সেদিন  জঙ্গলের  একটি রঙিন প্রজাপতি
দার্শনিককে নিয়ে যায় 
একটি শুঁয়োপোকার কাছে
দশমীতে জলে ভাসমান মা দুর্গার মুখ
মনে করিয়ে দেয় 
ষষ্ঠীর বোধন আর সেই ঘাম তেল
বটগাছের নিচে বসে ভাবনাতে আসে 
অঙ্কুরিত দুটি সবুজ পাতা 
বোধ আর দৃষ্টিভঙ্গির মিলনমেলায় 
চেতনার খোলামেলা আলোচনা 
শ্মশানে সারি সারি শবের মধ্যে একজোড়া দম্পতিও
আলাদা আলাদা চিতার আগুন 
এসেছি একা যাবোও একা এমন বিজ্ঞাপন 
আগুনে আগুনে
সবটাই বাস্তবতায় মোড়া নির্ভেজাল দর্শন...


তেজপাতা 
 
যেদিন প্রথম শাড়ী কবিতাটি পরি বোধের সিঁড়িতে যেনো পা রাখা আমারকবিতার ভেতর থেকে নিংড়ে নিতে ইচ্ছে করেছিল আকাশী রংটাকবির কলমের আঁচড়ে তেজপাতার রঙে হেঁটেছিল আমার দীর্ঘশ্বাসশাড়ির সমগ্রতায় বাঁচাও শব্দের ভেতরে দেখেছি পোড়া মনুষ্যত্বের ধোঁওয়ামনের ভেতরে তোলপাড় করা আস্থাহীনতা আর নৈরাশ্যের ঝড়যে ঝড়ে খুঁজে পেয়েছি কবিত্ব বোধ, ছয়তলার বারান্দা আর নিচের পৃথিবীর সুস্পষ্ট ছবি

 
খোলা জানলা 
 
কবিতা তোমার ডাক নাম দিলাম ভালোবাসা
সে আমার বুকের বামদিকে 
ঘুরে ফিরে বেড়ায়,
তোমার জন্য শব্দেরা মানিব্যাগে থাকে না। 
খরচে কার্পণ্য করিনা,
তোমার সমালোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণে এক বুক নদী বয়ে যায়... 
অথচ তুমি থাকো পালপাড়ার এঁটেল মাটির মতো নরম
 
তোমাকে নিয়ে বাঁধাধরা শব্দ আর কিছু নিয়ম তৈরি হয়,
অথচ তুমি থাকো, পাহাড়, নদী, ফুলে,
তুমি থাকো ব্যথা, আনন্দে আর চিরচেনা আলপথে অনাবিল
ব্যস্ত থাকো সময়ের হাত ধরে  মুহূর্তকে জাপটে ধরবে বলে
তোমাকে জড়িয়ে সত্যেরা হয়ে ওঠে স্পষ্ট, 
খুঁজে পায় আত্মক্ষরণের বিশুদ্ধ কালি
মাঝে মাঝে তোমার ডাক নাম নিয়ে ভাবি...
খোলা জানালা? 
কবিতা তুমিই কি সেই উদার, 
দিগন্ত দেখতে পাওয়া ভালোবাসার... 
খোলা জানালা?

 

বসন্ত ( তিন) 
 
সাদাকালো ছবির ভেতর 
বসন্তের গানের স্বরলিপি আজো আছে জেগে, 
পুবের দরজা খুলে দেখি কাঁটা তারে আটকে আছে 
অজস্র বনজুঁই,
পশ্চিমের দরজা খুলে দেখি বোগেনভিলিয়া
দেয়ালের গায়ে দুলছে,
সাদাকালো ছবির ভেতর
এখনো ছোটাছুটি করে খোঁপাতে কাঠগোলাপ নেওয়া
সেই উনিশের মেয়েটি ,
দক্ষিণের জানালা খুলে মুখে চোখে বাতাস মাখতে চায় ,
সাদাকালো ছবির ভেতর
বেবাগা মন খোঁজে শালপিয়ালের বন...

 
ভালোবাসা কারে কয় 
 
তুমি গাছের পাতায় 
কবিতা লিখতে পারো?
না না পারিনা 
তুমি খাতার পাতায় জলরঙে ছবি আঁকতে পারো?
না তাও পারিনা,
তুমি দুখ জাগানিয়া অথবা ঘুম পাড়ানিয়া 
গান গাইতে পারো ?
সে কেমন গান জানিনা তো
তাহলে কী পারো তুমি?
আমি পাতার রঙে নিজেকে ডোবাতে পারি
মনের খাতায় একটি হলুদ বসন্ত দিতে পারি
গানের সুরে চোখ বন্ধ করতে পারি
আঁধার রাতে একটি জোনাকি হতে পারি 
আর আর...
তোমার অগোছালো, এলোমেলো ভাষাকে 
আমার ভালোবাসার আলমারিতে 
যত্নে রাখতে পারি  
 
 
   
কবিতা কুটির
 
মাটির উঠোন, চালে শুয়ে আছে পুঁই,
বাঁশের বেড়াকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা শিশু লাউ এর
টিনের দরজার ওপর থেকে ঝুলে পড়েছে মাধবীর ঝাড়,
লাতা দেওয়া উঠোনে নয় মাসের শিশুর হামাগুড়ি
গুগলীবেচা শান্তি মাসির সরল হাসি,
সরলতা আর পবিত্রতা মিলেমিশে একাকার...
ফুলমনির দুধে দাঁতের হাসিতে 
কুটির হয়ে ওঠে আলোকের ঝর্ণা,
ওরা ভালোবাসা দিবস জানেনা,
জানে ভালোবাসা, জানে ভালোবেসে
রোগের উপশম ঘটাতে

 
বোধ যখন স্পর্শ করে 
 
বারো বছরের মেয়েটি জানতোনা 
অমৃতলোক কাকে বলে, 
বাবা,মা আর পিসির সাথে পুরী ভ্রমণ,
স্বর্গদারের কাছে যেতেই বাবার হ্যাঁচকা টানে 
মেয়েটি বাঁ দিকে ডান দিকে চলে,
আগুন জ্বলছিল, কৌতূহলী মেয়েটি থমকে দাঁড়ায় 
কুড়ি বছরের মেয়েটি 
মধুচন্দ্রিমায় যায়, সাগরের লোনা জলে গা ভাসায়
পুরোনো ছবির অ্যালবাম থেকে জেগে ওঠে 
শৈশবে দেখা আগুন আর কাঠ ফাটা শব্দ 
আটকে যায় দুটি পা আর কৌতূহলী মন ও
স্বামীর ভালবাসা আর আবেগ 
এক মুহুর্ত দাঁড়াতে দেয়নি সেখানে
পঁয়তাল্লিশ বছরের মেয়েটি 
স্বর্গদ্বারের  দরজার সামনেই,
সে জানে অমৃতলোক কী, না ফেরার দেশ কেমন হয়,
সে জানে ঐ আগুনের মানে,
সে জানে আছে দুঃখ,আছে মৃত্যু 
বিরহ দহন লাগে
...
 

হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

অন লাইন

টাকার কয়েন নোট   
এটিএম ব্যাঙ্ক লেনদেন
দোকানের সাবেকি সতর্কবাণী
আজ নগদ কাল ধার’
নিখোঁজ সবাই
 
অন লাইনে চলবে সমস্ত খোরাক

 

অসহায় 

কান থাকলেই যায় না শোনা
চোখ থাকলেও দেখা,
ঘরভর্তি লোক থাকলেও
বুড়ো বুড়ি একা।
 
মুখ থাকলেও যায় না বলা
হাত থাকতেও ঠুঁটো,
পা আছে তাও হাঁটায় লাগাম
বুড়ো বুড়ি দুটো।
 
কোমর আছে জোর কোথা পায়
বেঁকেছে শিরদাঁড়া,
সবার পেটে মুখরোচক
বুড়ো বুড়ি ছাড়া।
 
 
শিশু কিশোর যুবারা সব
কত বুদ্ধি খাটায়,
আগে পরের চিন্তা থাকে
বুড়ো বুড়ির মাথায়

 

আত্মকথন

জীবন শরীরকে বললো, ‘তুই থাকবি তো থাক্। আমি চললুম।’ শরীর বললো, ‘তুই না থাকলে  উলঙ্গ করে আমাকে লাঠিপেটা করে পুড়িয়ে মারবে, ওরা। তুই থাক্।’ জীবন বললো, ‘আর কতদিন তোকে আগলে রাখবো, বল! আরও কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে যে। আসার জন্য অপেক্ষা করছে। উৎকণ্ঠায় আছে। শরীর বললো, দ্যাখ, এখানেও সব উৎকণ্ঠায়।’
জীবন বললো, ‘উৎকণ্ঠা আমার দোসর। তোর কেউ না

 

সুখাসুখ

যেখানে বন্ধুর ভিড় সেখানেই সুখ
 
চার দেয়ালের মাঝে
অসুখেরা পেতে আছে বুক

 

সান্ত্বনা

কুয়াশা ভরা এ মন যেটুকু রোদ্দুর
বিছায়ে দিয়েছো তুমি তাতে কদ্দুর
এগিয়ে এগিয়ে যাবো হিমেল হাওয়ায়
কখন ফাগুন আসে তার প্রতীক্ষায়
দিন গুনি।
 
মাঘীপূর্ণিমার চাঁদ জেগে ওঠে
তার কাছে শুনি আগমনী

 

বাংলা ক্যালেন্ডার

ফিরে এসো তুমি বাংলা তারিখ
বাঙালির ঘরে ঘরে,
নজর রেখেছি তাইতো এবার
বাংলা ক্যালেন্ডারে।
বাংলা মূখ্য ; ইংলিশ ও আছে
তারিখের নিচে নিচে,
ক্যালেন্ডার তো কিনেছি তখন
ভাবিনি তো আগে পিছে।
শহরের বাড়ি ঝাঁ চকচকে
টাইলস ও মার্বেল,
দেয়াল ঢেকেছে;  পেরেক কোথায়
মনে বাড়ে উদ্বেল।
কেন্নো যেমন গোঁটায় শরীর
লজ্জা কিম্বা ভয়ে,
ক্যালেন্ডারটি গাডার আটকে
টেবিলেই আছে শুয়ে।
 
চোখ থেকে বালি সরাও বাঙালি
আবেগ মান্ধাতার,
দেয়ালে না লিখে দাও হে টাঙাতে
বাংলা ক্যালেন্ডার

 

শ্রম

বিশ্রামেরও বিশ্রাম নেই
শ্রমে বিষ মিশিয়ে ওরা
মোরগের ডাকটুকুও শুনতে দেয় না
কারখানার ঘর্ঘর শব্দে হারিয়ে যায়
বায়সের কণ্ঠস্বর
 
মৃত্যু নেই এই গরলে
পুষ্ট হয় হাড় ও পাঁজর

 

সবিনয় নিবেদন

এই স্কুলে একটি মেয়ে পড়তো দিদিমণি
আমার তখন কলেজ-বয়স ব'লেই
আপনাকে ব'লতে পারিনি সে ছিল
আমার এই শহরের চতুঃসীমা
তার ডেস্কটি আমাকে দেবেন ম্যাডাম
 
কাঠের জিনিস পেলেই সে তার নাম লিখে রাখতো

 

গুপ্ত

চিত্র গুপ্তের গুপ্ত চিত্র
করতলে আঁকা
 
এখানেই গ্রহ দেখে
জ্যোতিষীর চোখ
 
হালের বোঁটা
গুপ্ত রাখে
চাষীর করতল

 

জম্মভাষা

হাসল্লবি করিস না
মানভুঁইয়া বলার মু থাকা চাই
লেইখবার দম থাকা চাই
কুইড়মালি বুঝিস!
 
দকড়কচ্যা ই মাটিতে
যে ভাক্কিগিলা জম্মেছ্যে
নার্সারিল্যাও উহার লাইগ পাবি নাঞ
 
জম্মিতে হবেক ইঠিনের গাঁয়ে

অভিজিৎ মান এর কবিতা

 

                           

অভিজিৎ মান এর কবিতা




ডিফিউশন


নদী বয়ে যাওয়ার মতো

শুকনো মাঠে রোদ পড়ার মতো

বায়োপসি হওয়া শরীরের মতো।

মুক্তি দিয়েছো।

সোরিয়াসিস বাড়ি বানিয়েছে।

ভোর ৩.৪৬ অব্দি নিম গাছের চেহারা দেখলাম।

সিগারেটের অপেক্ষা রাখে।

অপেক্ষা ছিল সাদা পেঁচাটার।

 

সালিম আলী বুঝেছিল আর আমি বুঝলাম

রোগ, পাখিটার রোগ

বাসা পাল্টানো ধর্মে

বাসা পাল্টানো এদের জিনে।

শান্ত চোখ গুলো মনে পড়ে

ভিডিও কলে ঘর পাল্টায়

স্বপ্নেরও মুক্তি জীবনানন্দের কবিতায়।

মুক্তি দিয়েছো।

মা শীতলার অপেক্ষায় থাকি।

              

 

ভাইরাস           

                            

অনেক ভালো ছিলাম।

উত্তরে শীতের কনকনে বাতাস ছিল না।

ছিল না ভোর রাতের ফোন

নিশ্চুপ নির্বাক ইউটিউব।


ছিল না গোল গোল কুন্ডুলিত

রাতভোর।

বুকের ভিতরের গুমসে যাওয়া আওয়াজ ।

বারমুডা ট্রাঙ্গেলের ভেতরে চলে যায় স্ট্যাটাস মেসেঞ্জার।


বড় খাপ, খাপের ভেতর আমি

তোমার চোখ স্থির

খাপ বানাতে তুমি পটু।

রঙিন খাপ বানিয়েছ। ভিতরে ভিতরে  আলো ছড়িয়েছে। মদন মোহন সাক্ষী থাকলেন।


তাহলে কি আমি আবার জবাই হলাম?

 

 

পোস্টমর্টেম

 

তুমি বুঝতেই পারবে না

কখন তোমার উপর দিয়ে মনোলিনগূয়েল হাইপোথিসিসের বাতাস বইবে।

সে সময় বাতাস হয়তো তোমার ভালো লাগবে না।

অভ্যাস হবে। তারপর।

মনে হবে পৃথিবীটা তোমার

মনে হবে চারিদিকে আনন্দ।

ছবি কথা সব আইফেল টাওয়ার মনে হবে।

ইচ্ছে অনিচ্ছাতে

শরীর তুচ্ছ

মন তুচ্ছ

উষ্ণতার আতর

আর শুধু সময়ের বড় বড় প্যাকেজ নিয়ে

হৃদয়ে হৃদয়ে আঠা লেগে যাবে।


তারপর একদিন কোন এক গ্রামে মদনমোহন সাক্ষী হয়ে থাকবেন।

ইমোশনাল টর্চার চলবে।

পোস্টমর্টেমের খবর হবে।

 

 

ডিমোশন

          

একটার পর একটা পাথর সাজিয়ে

তৈরি হল কাঁচা মন্দির

ভরসার, আবেগের

সব,ই মালিকের ইচ্ছে।

 

মালিক এবং শিল্পী দুজনের ভাবনায়

শুরু হলো কারুকার্য চলতে থাকল এক মাস দুমাস

টেরাকোটা, ভেতরে ডোকরা, বীর হাম্বী ভাবনায়।

মালিক শিল্পী একদিন প্রাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে

কাছাকাছি এসেছে।

প্রাণ ও‌ প্রতিষ্ঠা হল।

সময় করে উপাসনা

রীতিমত যাগ যজ্ঞ বিজ্ঞান


হঠাৎ মালিকের ইছে হল বিগ্রহ আর রাখবে না। ছাড়তে চাইনা শিল্পী।

এরপর কি মন্দিরটা ধ্বংস হয়ে যাবে?

এরপর কি শিল্পী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে?

গন্ডা খানেক সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট।

শিল্পীর ডিমোশন হয়েছে নাকি!


তবুও ঈশ্বর থেকে গেল।

ঈশ্বরকে টলানো গেল না।

হয়তো মালিক ফিরে আসবে।

হয়তো শিল্পীর ডিমোশন হবে না।

 

মহলম          


তোমরা মহলম মাখাতে যাচ্ছ।

মাখিয়ে নিচ্ছ মহলম।

নামিদামি ব্র্যান্ড।


কত সহজে রাস্তা পারাপার করছো

মন পারাপার করছো।

চিরকুটে তোমাদের নাম বন্দী হয়ে থাকছে।

এই চিরকুট চিত্রগুপ্তের নয়।


সুবোধ বাউরির ছেলে ব্যাটারির।

হাফ দিন মজুর এখন।

সন্ধ্যায় তাসা বাজায় মদ তাকে ধরেনি।

অসুখ হয়েছে।

 

মন্টু পারসির ছেলে ঝিকিমিকি।

মারওয়ারী দোকানে কাজ করে।

অসুখ হয়েছে ।


আর আমরা

বউয়ের পাশে বসে মিউচুয়াল ফান্ডের হিসাব করি।

মহলম মাখিয়ে ।

মহলম মাখিয়ে ।

পত্রপত্রিকা পড়ি। সাহিত্য করি।


আমাদের কোনদিন কোন অসুখ হয় না।

অসুখ হবেও না

নিউজ চ্যানেলে চোখ রাখি।

বিসনয় আমাদের চারপাশে রয়েছে।

আমার পৃথিবী আমার কবিতা




বিতার  হৃদয় খুঁড়ে পাঠক যখন তার মর্মোদ্ধার করেন তখন একজন  কবি কি জানতে পারেন পাঠকের অনুভব! আমার অনন্ত  প্রতীক্ষা সেই সব পাঠকদের জন্য। তাঁরা আমার কাছে ঈশ্বর। তাঁদের সমালোচনা আমার কাছে আশীর্বাদ।





পদ্য থেকে গদ্যে

 ভজন দত্ত

“আকাশের অজস্র নীলখিদের পেটে গরম গরম ল্যাংচা এঁকে ঝুলিয়ে দিচ্ছো, তোমার কারা!

সমাধিস্থলে এঁটোকাঁটার উল্লাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে টুম্পা নাচে পিকনিক সিটি মেরে সেল্ফি খিঁচে গেছে যারা, তারাই বা কারা!

ছেঁড়াদড়ির খাটিয়ায় শুয়ে থাকা মানুষগুলোকে শুশনি শাক ও কলমিলতা অনলাইনে কেনার জন্য জোরাজুরি করছে যারা, তারাই বা কারা!

কুরচি ফুল,শাল ফুল,পিয়াল ফল, সীতাপাতা লুঠ নিয়ে যারা সেমিনারে পাত পেড়ে খেয়ে গেল, ওরা কি মানুষ! ওরা কি ভুখা!

মরানদী, ধুধু বালি, ফুটিফাটা মাটি দেখে যারা কুমিরের কান্না গেয়ে গেল মশকরা রসে,তারা, তারা কারা!

কারা যেন বলেছিল 'টোনাটুনির সংসারে ছিটকানি! জরুরত কেয়া!' রামনাম সত্য করে ওদের জলজমিজঙ্গল লুঠ করে 'পাল্লামেন্টে' পাল্লা ভারি করার কামড়াকামড়ি খেলা খেলে যারা, তারা কারা!

২৪×৭ ফিরির নেট খাইয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেন হাহাকারের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে যারা ঘুষের টাকার দালালি খেল,তারাই বা কারা!

মানুষ জন্মকথাকে যারা চির নষ্টকথায় বদলে মানুষে মানুষে ভিনু করে দিল সেই ব্যাপারীদের বাড়তে দিল কারা!

 এমত সকল বিস্ময় বিস্তারিত হলে কবিতা আর কবিতা থাকে না আনারকলি!

চলো, এবার পদ্য থেকে গদ্যের দিকে ছুটে  চলো। মগজে শীত জমছে! বিছানার এত রোদ খিদে বাড়ছে রোজ!

চলো, রোদ ধরাধরি করি শীতলতম দিনে, না হলে খেজুর গাছে চড়ে দেখো,পৃথিবীতে রোদ ও নলেনগুড়ের কদর আজও তেমনি রয়েছে…”

 

নিজের কবিতা নিয়ে লেখা শোভনীয়, না কি কালবৈশাখী, সেই কথাটি জানেন মশাই সম্পাদক । এই যে কবিতাটি আপনাদের সমীপে রাখলাম এর জন্ম ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গ, তিথি নক্ষত্র পাঠকের পাঠ সময়,  এর জন্মস্থান জঙ্গলমহল। জঙ্গলমহলের বিস্তৃতি ধরতে গেলে পাঠককে বাঁকুড়া পুরুলিয়ার প্রকৃতি,  সাধারণ গরীব খেটেখাওয়া মানুষের যাপন, জীবনের কাছে এসে দাঁড়াতে হবে। সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে সময়, যে সময় আমরা পার হয়ে চলেছি সেই সময়।সময়ের মার সহ্য করতেই হয়।  এই সময়ে ভার্চুয়াল আনন্দ, শোক, রাগ, ঘৃণা,বিপ্লব নিয়ে আমরা যখন মাতামাতি করছি। সেই সময়কে ভুলে, মানুষকে ভুলে আমরা যখন উল্লাসে চরম ডুবতে ডুবতে দমবন্ধ হয়ে হাঁকপাঁক করছি, এই কবিতাটি  সেই সময়ের কবিতা।

জঙ্গল মহল থেকে হারিয়ে গেছে অনেক কিছুই, তবুও  এখনো যা আছে তা হলো গর্ব করার মতো উদার অকৃপন প্রকৃতি। প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে  বিস্ময়সূচক চিহ্নটি আগে ভেবে নিন, তারপর পড়ুন,

আকাশের অজস্র নীলখিদের পেটে গরম গরম ল্যাংচা এঁকে ঝুলিয়ে দিচ্ছো, তোমার কারা  

 আকাশে যতই নীল ভরে ঠেসে দিন না কেন, তার পেট ভরানো স্বয়ং স্রষ্টার পক্ষেও কি সম্ভব! বিস্ময় সূচক চিহ্নটিকে ল্যাংচা ধরলে এই পঙক্তিকে ধরা যায়। ল্যাংচা জঙ্গলমহলের এক জনপ্রিয় মিষ্টি। যা সাধারণত ‘বাবুঘরের’ ‘বিহাঘর’ কিংবা কোনো ভোজঘরের শেষ পাতে নিমন্ত্রিতদের পরিবেশন করা হয়। কিন্তু এখানে ‘নীলখিদে’ এই সমাসবদ্ধ শব্দটি দিয়ে আরেক খিদের কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। পৃথিবীতে পেটের নিচের খিদেও কি কিছু কম!

দ্বিতীয় প্যারাটি আরেকবার পড়ুন

“সমাধিস্থলে এঁটোকাঁটার উল্লাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে টুম্পা নাচে পিকনিক সিটি মেরে সেল্ফি খিঁচে গেছে যারা, তারাই বা কারা! ”

যে জঙ্গলে আমাদের বাপদাদাদেরর স্মৃতি রয়ে গেছে সেখানে দেখবেন পিকনিকের সময় নাগরিকদের উল্লাস। এখানে সেখানে মদের ভাঙা বোতলে নগ্নপদ হেঁটে গেলে পা রক্তাক্ত হবেই । সেলফিস সেল্ফির এই পৃথিবীতে হরদম সেল্ফি চাই আমাদের। নিজেকে জাহির করার ঢেউয়ে ভাসতে ও ভাসাতে সভ্যতার ভাসানযাত্রায় অসভ্যতার সিটির আগে পিকনিক শব্দটিতেই ধরার চেষ্টা হয়েছে এসময়ের কথা ।

এভাবেই একটু একটু করে কবিতার শরীর  নির্মিত হয়েছে। কবিতাটির  আধার সময়। ব্যক্তি মানুষের চিন্তাভাবনায় আছে সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতির কথাও। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলির বহুমাত্রিক অর্থে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি এবং চেষ্টা করেছি

 কবিতাটিও বহুমাত্রিক করার। আসলে, আমার প্রতিটি কবিতাই একটা চেষ্টা। জানিনা সেই চেষ্টায় কি গড়তে কি গড়ে ফেলি!

বিগত চল্লিশ বছর ধরে নানারকম লেখা লিখলেও এখনো  প্রতিটি লেখার পরেই আমার ব্যক্তিমননে এক আশ্চর্য সংশয় উপলব্ধি করি। আমার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে কুয়াশার মতো জড়িয়ে থাকে সেই সংশয়, কিছু কি হয়েছে! হোলো কি কিছু আদৌ! আমি কি বাংলা সাহিত্যে জঞ্জালই বৃদ্ধি করছি!  এই ভাবনা,এই সংশয় আমাকে কুরে কুরে খায় সবসময়। না, নিজের কবিতাকে এভাবে ভেঙে খানখান করিনি কোনোদিন। কবিতার  হৃদয় খুঁড়ে পাঠক যখন তার মর্মোদ্ধার করেন তখন একজন  কবি কি জানতে পারেন পাঠকের অনুভব! আমার অনন্ত  প্রতীক্ষা সেই সব পাঠকদের জন্য। তাঁরা আমার কাছে ঈশ্বর। তাঁদের সমালোচনা আমার কাছে আশীর্বাদ।