নয়ন রায়ের কবিতা

নয়ন রায়ের কবিতা


মহাকুম্ভে 


মহা মহাকুম্ভে নয়নও এসেছিল মেখে নিতে
জীবন, আধ্যাত্মিক উপলব্ধির আলোকে কিছু
অমোঘ অমৃত! কোটি কোটি নরনারী আবেগেই
নশ্বর মানবদেহের কতটুকু বাড়ে আয়ুধ...!
 
সত্য শিব সনাতনী হিন্দুদের উপাস্য হিসাবে
পুজো পান! মিলনের শিব রাতে ডমরু বাজান?
প্রয়াগে মুড়িয়ে মাথা অহং ঘোচাতে থাকি নিজে
পিতা মাতা ও মরার পর, গঙ্গা না পাওয়া দিদি!
 
তাঁকে অমৃত কুম্ভের জলদান করার সুযোগ
কাজ লাগাই এভাবে। মাতৃসমা বড়দিদি তুমি
অমৃতলোকের পথে এগিয়ে যাও! সব কষ্টের
মায়াজাল ছিঁড়ে। ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি উচ্চারণ করি…
 
কান্না সব ধুয়ে দেয় আমার ঐ জলাঞ্জলি নদী
নির্মল করুক নিজের স্বভাবে আর আমি সুখে দুখে...! 



সারল্য 


কোনো অভিযোগ নেই!
সারারাত আত্মকল্পে আত্মরতি লিখে রাখি
পথের সারল্যে পথ মুখোমুখি...
অভিযানে আলো ও আঁধার সহজাত
 
বাঁশি বাজলেই সব শেষ! কালের রাখাল তবু জেগে থাকে...
 
মুগ্ধতার নীলে পাখিও মরমিয়া ঢেউ হয় গীত হয় গেরস্থালি!
আলোকভাসান পাঠ নেয় প্রতিবেশী ওমে আমাদের ক্রোধ!
 
আমার সারল্য মানে বোকামি ভাবো তুমি চিরকাল...!



কার্তিক


কার্তিকের পুজো! কুমোর পাড়ায় বনমালী পাল
যাত্রা করে রংচং মেখে। বউকে দেখায়- বলে
বল খেপি মানায়েছে কেমন তাহলে অসুর সেজেছে।
বনমালী! কখনও কখনও কালো দারোগার পাঠ।
 
ঘোড়া নাচে ঝন্টুকুমার। ভাসানের দিনে
তারে তাক তেরে তাক হে হে দে ছুট
ঘোড়া নাচে সারা গ্রাম জুড়ে, মাঝ রাতে ভাসানও
দেয় আর বলে আসছে বছর আবার হবে।
 
কেউ কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে রেখে আসে কুমার
কার্তি দুয়ারে দুয়ারে। সাথে চিঠি লেখা পুজো দাও পুজো
মনস্কাম পূর্ণ হবে। ঘরে আসুক নতুন কেতো কেতো
মানে কার্তিক আইবুড়িদের প্রেমিক চিরকাল



করমুক্ত


পাতি কেওটের মাছেরা পাতির আত্মার সঙ্গে ঘোরে ফেরে
কার পুকুরের থেকে কার পুকুরে ছাড়বে তারা বুঝে গেছে এত দিনে।
সারা বিকেল পাড়ায় মাছ বেচে নাতিকে স্কুলে পড়ায় গাঁয়ের মাস্টারের কাছে।
কুপির আলোয় আলোকিত হয় নাতির মুখ। পাতি কেওটের স্বপ্ন ভাগ করে নেয়
ঘোষপুকুর শোল। নাতি এখন গাঁয়ের প্রধান। ডিমপোনা বিলোয় কেওট পাড়ায়।
মাছের সংসারে ষোলসুখ...
 
সহজিয়া পাতি কেওটের জীবনটাও একদিন মাছ হয়ে ভেসে ওঠে হঠাৎ,
নাতিও জানতে পারেনি ঘুণাক্ষরে...।



অনুভবে নীল

 
হয়তো হঠাৎ আমি চলে যাব, তোমার অলক্ষ্যে
এত অপমান এত গঞ্জনাতে সব ছাড়িয়েই...!
 
হাসির শহর থেকে অনেকটা দূরে, বহুদূরে
নিশ্চিন্তপুরের দিকে! তখন আমার খুঁজে নিও
যে কথা তোমাকে সরাসরি বলিনি, সে কথা।
বুঝতে পারবে! কেন শুধু অপমান অনুদিত...
 
‘নিয়তজীবন যুদ্ধ বলিনি কাউকে নিরিবিলি
লিখে গেছি। মিলিয়ে দেখবে কারও সাথে মেলে না।
একটা নিজস্ব ভঙ্গি আছে। সাদামাটা জীবনও
অসামান্য হয় তখন উপলব্ধি করবে! দেখো।
 
প্রেমও প্রবাহ আনন্দে কাটিয়ে গেলাম। দুঃখকে
নির্বাচন আমি তো করিনি। উপহাস করে গেছি!
দুঃখকে ফেরি করে যারা তারা তো নিম্নবর্গেরই
সহানুভূতি পেতেই বাঁচে। ক্রীতদাস হয়ে থাকে!
 
আমার লেখাটি পোড়ো! বৈভবহীন জীবন নয়
দেখো কত মাণিক্য লুকনো ছিল অক্ষরে অক্ষরে।
একটু লিখতে দাও!  নিজের লেখাটি লিখে যাই
এ লেখাই ব্রহ্মবীজে মহীরুহ হবে...! বলে যাই...



আনন্দই ঈশ্বর


সুখশান্তি কে কাহাকে দেয়? আনন্দ তো
 নিজেকেই খুঁজে নিতে হয় চিরকাল জানি
আনন্দ হে তোমার সাথেই সখ্য করি রোজ
চৈতন্য জাগ্রত করি আনন্দে ঈশ্বর মাখি…



চর্যাপদ
 
আয় নেই সঙ্গতিহীনও তবুও নেশার ঘোর
সোনার সোহাগে ছাই ভস্ম ভূতনাথ লিখো
কী লিখো!  কাহাতক পদ্যের পৃথিবী ছোঁয়?
স্ত্রীর গঞ্জনা প্রত্যহ! তবু তুমি...  এতকাল 
 
ভুজ্যপত্রে জমা হয় কথার পাহাড়! হাড়ে
কালি পড়ে তোমারও! চর্যাপদ হয়ে বাঁচে...



আলোগান


আলোগুলি ফুটে ওঠে কুসুম কুসুম মোহে
আমার হৃদয় ক্ষতে! নদীও নাব্যতা খোঁজে
আলোড়িত আন্দোলন শরীরে দহন মাখা
কবিতার বীজ হয় মাঝরাতে ঘুমহীন পাখি...
 
শব্দগন্ধে জেগে ওঠে চাঁদ মায়াবি ইশারা
মেখেও নেয় 
কলমে! তুমি তবু নির্বিকার



সোজাকথা


না হাত চিরে লিখিনি আমি তোর নামটা রাখী
প্রতিশ্রুতিও দিইনি কিছু সহজ ভাষা লিখি
ইচ্ছে যদি আসতে হয় মিষ্টি হাসিমুখে
কথা দিলাম নিবিড় করে রাখবো আমি তোকে…



নাগা সন্ন্যাসিনী


নাগা সাধুমাতা ময়ূর পালক ঝাড়ু দিয়ে ঝেড়ে
দেন জীবনের বিষ! লোক চক্ষুতে স্বল্প বসনা
জীবনের লেন দেন বহমান এ নারীও নদী
হয় অনায়াস। আলো আলো বেঁচে থাকা পৃথিবীতে।




শক্তিপদ পাঠক-এর কবিতা

শক্তিপদ পাঠক-এর কবিতা

 


শীতঘুমে আছি

 

সারারাত ঘাসের উপর শিশিরের কণা জমে।

এই অনন্ত শীতরাত্রি, ঘনীভূত চাঁদ,

বুকে তার দূরগামী পাতাঝরা বন।

হলুদ পাতার নীচে জমে থাকা শীতঘুম

আমাকে নিবিড় করে কাছে ডাকে।

মাঠের গর্তের মধ্যে মেঠো ইঁদুরের

          চুরি করা ফসলের ভাগ

যে সব ছেলেরা নেয়, তাদের বারণ করো।

আহা! সব জীব বেঁচেবর্তে থাক।

আমরা সবাই তো একদিন

শিমুলপাতার মতো ঝরে যাবো শীতের বাতাসে।

তাই যত পারো ওম দাও,

মাঠে মাঠে ভালোবাসা দুহাতে ছড়াও।

শীতঘুম থেকে যেন জেগে দেখি

আবার নতুন পাতা ভরে গেছে সব গাছে গাছে।



প্রেমময় 

 


ঐ পথ কাদায় পিছল,

ও পথে তোমার যাওয়া মানা।

পতনের ভয় মিশে আছে,

ও পথের চোখ নেই, কানা।

 

এই পথ সোজা গেছে ঘরে,

পিচঢালা, খানাডোবা নেই।

দুইপাশে নুয়ে পড়া গাছ,

সাদরে ডাকছে তোমাকেই।

 

চোখের পাতায় জমা ঘুম,

নাকের পাটায় তিলফুল,

আমাকে অবশ করে রাখে,

হয়ে যায় সব কাজে ভুল।

 

আমি তাই ভুল পথে যাই।

কাদাকে ঘাসের মাঠ ভেবে

শুয়ে আছি জমে থাকা জলে,

আমাকে কি ঘরে ডেকে নেবে?

 

ঘরের মেঝেতে লেপা ছায়া,

ছায়ার গভীরে লেখা নাম,

নামের অতলে আছে প্রেম,

প্রেমময় তোমাকে প্রণাম।



জীবন


 

জীবন কিছুই নয় - একটি প্রদীপ,

তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে রাখা শুধু।

হাওয়ার ঝাপট থেকে দুহাতে আড়াল করে রাখি।

পাছে যদি নিভে যায় এই ভেবে সচকিত থাকি।

মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে আগুনের শিখাকে কাঁপায়,

তুমুল মুষলধারে বৃষ্টি নেমে

          আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়।

সলতে ফুরিয়ে গেলে একদিন শেষ হবে জ্বলা,

আঁধার লুটাবে পায়ে, শেষ হবে সব কথাবলা।

ভয় হয়, এভাবেই মুছে যদি যাই,

তার আগে আমি যেন একবার

                  তোমাকে নিবিড় করে পাই।



আহত সৈনিক 


 

পিছনেই থাকি।

তোমরা এগিয়ে যাও অভ্ররেণু,

বিনত ডালের সঙ্গে দোল খাও।

অনেক দূরের পথ, পাহাড়িয়া গ্রাম।

উঁচু উঁচু টিলার ভিতরে

    মেষচারণের ফাঁকা মাঠ।

ঘাস আছে, টলটলে জল আছে।

ওখানে রাতের শেষে অনুপম ভোর,

ওখানে দিনের গায়ে মখমলি রোদ,

ওখানে নাচের পায়ে উতলা ঘুঙুর,

নিবেদিত কথাগুলি সেইখানে

    প্রাচীন গুহার কাছে রেখে এস।

আমি আর সামনে যাবনা।

আমার পায়ের পাতা

    বেঁকে গেছে স্থলিত বিষাদে,

ইচ্ছা সব মরে গেছে।

এরকম পরাঙ্মুখ মন নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?



আত্মশুদ্ধি 


 

বেলা হল,

এবার নদীর ঘাটে স্নানে যাও।

বুকজুড়ে চ‍্যাটালো পাথর,

যা কিছু অর্জন আছে কাচাকাচি করো,

জলে নেমে ঠান্ডা হও, ঢেউ মাখো।

তোমার পায়ের তলা পথের উত্তাপে পুড়ে

                                  কালো হয়ে গেছে,

ফোস্কাপড়া চামড়ার ভিতরে জমা দাহরস,

এখানে জলের মধ্যে তারও জেনো

                                  নিরাময় আছে।

স্নান সেরে ধীর পায়ে উঠানে দাঁড়াও,

চেয়ে দেখ, ধোঁয়া ওঠা ভাত

          এখনও তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে।



আকাঙ্ক্ষা


 

অপরাধগুলি মাটিতে নামিয়ে রাখি,

          পোড়াব যে, সে সাহস নেই।

এখন আমার দেহ পালকের মত

          আলগা বাতাসে ভাসে।

এসো ঝড়, আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাও।

পাথরের মত ভারি পাপগুলি

          যেন না পাঁজরে উঠে আসে।



পাতালছায়া 


 

ঘরের পাশেই ঘন বাঁশঝোপ,

          ঐখানে পেঁচাদের বাসা।

রাতের শিকার সেরে দিনের বেলায়

ঘুমঘুম চোখে নামে হিম ভালবাসা।

কুটুসের ফুলগুলি তারার মতন

ফুটে থাকে আঁকাবাঁকা পায়েচলা

                  পথের দুপাশে।

উইয়ের ঢিবির থেকে খরিসের ছানাপোনা

          ভুল করে ছায়াছায়া দিনের আলোয়

                  বাইরে বেরিয়ে চলে আসে।

ওইখানে বসে থাকি বাঁশের মাচায়,

          তখন তোমাকে মনে পড়ে।

আকুল শিকড় নামে পাথরের কোল ঘেঁষে

মাটির গভীরে, অটল দাঁড়িয়ে থাকে গাছ,

                  আমাকে উড়িয়ে নেয় ঝড়ে।

পাক খাই লাট খাই ধানক্ষেতে মাঠে,

ছেঁড়া সুতো, কার হাতে স্থবির লাটাই!

পেঁচার ঘোলাটে চোখে ঘুমঘুম ভালবাসা,

খরিসের বিষদাঁতে ফোঁটাফোঁটা ঝরে পড়া

    মুক্তোর দানার মত বিষ বুকে নিয়ে

          আবার তোমাকে পেতে চাই।



স্বপ্নে দেখা বাড়ি 


 

তোমাদের বাড়ি যাব বলে

সেই ভোররাতে বেরিয়েছি,

          পথ খুঁজে পাইনি এখনও।

দু কদম না যেতেই

গমক্ষেত শীষ নেড়ে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে,

গোপনে ভাংচি দেয় - এইভাবে যেওনা কখনও।

নদীর জলের নীচে রুপালি মাছেরা নাচে,

নাচ দেখি, ঢেউ দেখি, শস‍্যের সবুজে দেখি মায়া,

দুপুরে প্রখর রোদে বটপাকুড়ের গাছ

          মাথায় বিছিয়ে রাখে ছায়া।

বিকেলে নরম আলো

ভালবাসা ঢেলে দেয় পাখিদের গানে,

পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে খিদে পেটে বসে পড়ি

জীবন আমাকে ফের বাস্তবের দিকে টেনে আনে।

নিজের ঘরের কাছে ফিরে আসি ফের

          কেউ এসে ডাক দেয় - ‘শোনো।’

তোমার অদেখা বাড়ি বহুদূর

          যাব ভাবি - যেতে চাই,

                  যাওয়া তবু হয়না কখনও।



বিরহ 


 

রাস্তার দুধার জুড়ে রাধাচূড়া গাছে

তোমার গালের স্নিগ্ধ কোমলতা আছে।

আমি তাই বসে থাকি পথের উপরে

          যদি কোনো ফুল ঝরে পড়ে।

তোমার চুলের গন্ধ বয়ে আনে প্রেমিক বাতাস।

বেদনামথিত দীর্ঘশ্বাস

          ছুঁয়ে যায় আমাকে সহসা,

মনের গোপন ঘরে আলো জ্বলে, আলো নেভে,

          বিস্ময়ে হারিয়ে ফেলি ভাষা।

তুমি এক আলোর প্রতিমা।

তোমাকে খুঁজতে গিয়ে পার হই ম্লান দৃষ্টিসীমা।

তবুও হয়না কাছে পাওয়া,

তোমাকে উড়িয়ে নেয় ভিনদেশি দূরগামী হাওয়া।



আশা 


 

একদিন সবকিছু ফিরে পাব।

নিকানো উঠানভরা ধানের মরাই,

কাগজিলেবুর গাছে শালিকের বাসা

                                  আর খিড়কি পুকুর।

মাটি খুঁড়ে লুটে নেওয়া সোনার মোহর ফিরে পাব।

গোয়ালে আবার কালো নতমুখী গাভীটির

                   নতুন বাছুর হবে।

কেন্নো, কেঁচো, হেলেসাপ এখানে ওখানে ঘুরে

ফিরে এসে জীবনের কাহিনী শোনাবে।

ক'টাদিন কষ্ট করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাক।

বেড়া দাও চারপাশে, খড়িমাটি গিরিমাটি গুলে

          দেওয়ালে শিশুর মুখ আঁক।

এখন অশান্ত স্রোত শক্ত করে ধরে থাকো হাল,

রাত ঠিক কেটে যাবে, আলো নিয়ে আসবে সকাল।

সুবীর সরকার-এর কবিতা

সুবীর সরকার-এর কবিতা

 

পরিচিতি:

সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

 

 

সাজঘরের কবিতা


১.

নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দাঁতের ধার।

তাঁবুতে কুপির আলো, বইয়ের খোলা পাতা।

ড্রাগনের ছবিতে মাল্যদান শেষে শুরু হবে

                                       বিশেষ অধিবেশন


২.

আমরা গাইতে শুরু করি গান।

ঢুকতে শুরু করে নাচের দল।

চুল খোলা মেয়েরা অন্যমনস্ক হলে ভালো লাগে

                                                             না


৩.

জংলী হাতির দলে হরিণ ঢুকে পড়লে সক্রিয় হয়ে

                                      ওঠে গোপন ক্যামেরা

লং মার্চ শুরু হতেই

দৌড়তে থাকে কাদামাটির 

                                     পুতুল।


৪.

বস্তুত সব কিছুই রোমহর্ষক।

নদীতে ডুবে যাচ্ছে নারী।

শুকনো পাতার জঙ্গলে হলুদ রঙের

                                           ফুল।


৫.

হারিয়ে যাওয়া বেড়াল ফিরে এলে তার মাথায়

                                        পরিয়ে দেওয়া হয় টুপি

নীরবতার ভাষাকে অনুবাদ করতে গিয়ে

                                              খামারবাড়ি লিখি

ঘন হয়ে আসে সম্পর্ক।

খড়মের শব্দে দেখি জেগে উঠছে তোমার শীতল

                                                         চোখ


৬.

নূপুর হারিয়ে গেছে সেই শোকে আঠারো মাস তুই 

                                                            বিমনা

ধানক্ষেতের সামনে একটা বাড়ি।

অথবা বাড়ির সামনে ধানক্ষেত।

স্বপ্ন ভেঙে যায়।রুমাল ও পতাকা নিয়ে

                                            জলজঙ্গলে ঘুরি


৭.

সমস্ত পুতুল আজ সাজঘরে মজলিস বসায়।

প্রিয় কোন গান যখন ভাষান্তরে শুনি 

মনে হয় তরাই জঙ্গলে লণ্ঠন দুলে 

                                               উঠলো

যে ভাষায় মিছিল লিখি।

যে ভাষায় জনপদ লিখি।

সেই ভাষা নিবিড় হয়ে আসে বটবৃক্ষের ছায়ার

                                                             মত


৮.

বসন্ত উৎসবের গায়ে হেলান দিয়ে হেসে ওঠে মার্চ 

                                                         মাসের দুপুর

আমাদের সাদামাটা জীবন।

বারান্দা ও রাস্তা জুড়ে হাজার হাজার

                                                  পিচকারী।

বাতাসে আবির ওড়ে।

সর্বাঙ্গে আবির জড়িয়ে আমরা আবার গাইতে শুরু

                                                       করি গান     

 

৯.

ফাঁকা মাঠের ভেতর জোনাকি দেখেছো তুমি!

অন্ধকারে হলদে পাখির ফিসফিস।

দূরের নদীর গন্ধ,চিনি আর বাতাসার 

                                                 ক্যানভাস।


১০.

নূপুর হারিয়ে গেছে সেই শোকে আঠারো মাস তুই 

                                                            বিমনা

ধানক্ষেতের সামনে একটা বাড়ি।

অথবা বাড়ির সামনে ধানক্ষেত।

স্বপ্ন ভেঙে যায়।রুমাল ও পতাকা নিয়ে

                                            জলজঙ্গলে ঘুরি

 

কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা

কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা




ছুঁচসুতো

 

সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই

যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম

আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস

আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো

অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে

সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক

 

ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি, 

ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই

গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ

 

বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল 

টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান

এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি

কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে 

 

সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই

রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!




নাটুয়া 

 

গভীর ইঁদারাটির কাছে যাই, উঁকি মারি 

ভেতরমহলে কার, নাটুয়া শরীর!

প্রতিবিম্বে শুয়ে আছি অনন্ত তরল

জাগতিক ভ্রম মেখে অসম্ভব স্থির

 

শঙ্খলগ্ন নিয়ে কত যে বলার ছিল কথা

তিলের বিলাপ নিয়ে জটিল বিভ্রম 

হৃদিপদ্মটিতে এতদিন কাঙালপণায় 

ছিল যে রেণুবিলাস, তার কথা বলতে পেরেছি কই!

ঝরে ঝরে পড়ে গেছে অসমাপ্ত শ্রম

 

মধুলোভি মৌমাছিদের চক্রাবর্ত পথে 

নিস্ফল খুঁজেছি কিছু জান্নাতের ঘোর

সিঁঁধ কেটে নিয়ে গেছে মহাকাল চোর

 

অন্নদামঙ্গল আজও হয়নি তো পড়া 

মোহিনীরূপের ভেতরে যে

কুচযুগ মেধাবী বর্ণনা, এখনও অধরা

 

কুয়োর অতল তলে পড়ে আছে নাটুয়া শরীর 

পরনে পোশাক এক জাদুকর মায়া, জাদুর ধরম

                                      শত শত চুমকি বসানো

 

ভীষণ ধাঁধিয়ে দিই দর্শকের দৃষ্টির বিভ্রম



 

মেছুনী 

 

মেছুনির নিজেরই শরীর যেন বঁটি হয়ে থাকে

ইস্পাত কঠিন তার ভীষণ ধারালো 

ফালাফালা কেটে যায় খদ্দেরের চোখ 

পিছল শরীর তবু চরম নাব্যতা ধরে

কার্ভেচার আর ক্লিভেজের ঘরে 

থরে থরে সাজানো বন্দিস

 

মেছুনির সোমত্ত শরীরে রেণু হয়ে লেগে থাকে 

                                                    খদ্দেরের ভ্রম

ভ্রমের ভেতরে পরকীয়, অনন্ত পিপাসা

মাছের আঁশটে গন্ধ ঘেটে দেয় 

                                            ঘোরের বিভ্রম

 

বঁটির উপরে ফালা হয়, আসঙ্গ লিপ্সার থেকে 

লাফ দিয়ে নেমে আসতে চাওয়া বাঘ

 

উদাসীন মেছুনি এসবই জানে

মাছের আঁশের নিচে ঘন হয়ে জমে থাকে 

                                                     পদ্মগোখরোর থুতু

ছিটকে গেলে অন্ধ হবে কামুক বায়স

 

মরা মাছ খণ্ড খণ্ড কেটে দিতে দিতে

ভ্রূক্ষেপবিহীন সেই আগুনে মেছুনী 

শরীরী বঁটিতে আরো কৌশল ঢুকিয়ে 

নেড়ে দেয় খদ্দেরের পৌরুষের থলি

 

মরা মাছ নিয়ে থলি হাতে বাড়ি যায় সম্মোহন



 

এমন জলের কাছে 

 

এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল

তারও তো আছে এক চিত্রল হরিণ,

নিভন্ত কপাট খুলে যখন বেরিয়ে আসে 

জায়নামাজ তুলে রেখে কবিতা পড়তে বসে গালিব…

 

এমন জলের কাছে আশ্চর্য ফুটুনি নিয়ে 

কখনও যেওনা পরাশর 

তাহলে কোনদিনও পাবেই না তোমার মৎস্যগন্ধাকে… 

 

দেখবে তখন, সিন্ধুঘোটকেরা প্রকৃত দর্শন ভুলে 

এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে 

সমুদ্রতটে ঘুমিয়ে থাকা ঝিনুকের বুক।

 

এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল, 

দেখ তার থরথর ঠোঁট, ঠোঁটের অলিন্দ বেয়ে

গড়িয়ে গড়িয়ে নামা রাধিকা অসুখ...



 

যজ্ঞভূমি

 

বেড়া বাধার কালে ওপাশে বন্ধন দড়িটি 

শক্ত করে ধরে রাখে যে, সেই তো আমার মা!

তবু তার গর্ভজলের গন্ধ পেয়েও বুঝতে পারিনা 

ব্রহ্মাণ্ড থেকে উঠে আসা জগৎ সর্পভ্রমে রজ্জু নয়

আর এই জগতের নাভিমধ্যে যে কুয়ো, সেখানে 

ডুব দেওয়া সহজ কথা নয়, যে পারে সেই পারে, 

তখন তার শরীর হয়ে ওঠে সেই কাঠবেড়ালির,

উন্মাদ হয়ে যে খুঁজে ফেরে প্রকৃত যজ্ঞভূমির...

 

অতলান্ত সাগরের ঢেউগুচ্ছে আলো জ্বেলে বসে আছে 

যে রমনী, তাকে একবার মা বলে ডেকে দেখ, 

ব্রহ্মের নাভি থেকে বেরিয়ে আসা শক্তির দোলা খেতেই

ডিঙি নৌকা হয়ে উড়ে যাবে অসীমের দিকে...

 

সেখানে তো কোনও পাহাড় নেই কেবল অতলের মুখ…

 

মৃত্যুর ভেতর থেকে বের হয়ে 

কতকাল ধরে লেগে থাকা অপমান মুছে

তপস্যায় যাবে সেই প্রাচীন শম্বুক...



 

মধুযামিনী

 

এমন যে রূপকল্প তার কাছে থিতু হয়ে বসি।

দেখি, সে রূপের মঞ্জরি সকল, 

অক্ষর প্রতিমা হয়ে ওরা সব ভ্রমর-ভ্রমরী,

মিথুনমূরতি মাখা রাধা মাধবের ঘাটে জলকেলি করে...

বিদ্যুৎ তরঙ্গ এসে এঁকে দেয় আলিঙ্গন কুসুম অগ্নিতে...

 

নৌকাবিলাসের দিকে এখন যাব না কিছুতেই,

উবু হয়ে বসে দেখে যাব রতিকল্প রূপ,

বৈষ্ণবের রসকলি সাজের ভেতরে

দেখব কেমন কুঞ্জবন আঁকা,

রাধাকৃষ্ণ লীলা খেলে রাসের বিস্ময়,

ললিতা বিশাখা আর চন্দ্রাবলী ঘোর...

 

এমন রূপের কাছে বসে, 

যেন গেয়ে যেতে পারি গোবিন্দের গীত, 

রাইয়ের নূপুর থেকে তুলে নিতে পারি

পয়মন্ত পরকীয়া ঘোর...

 

যেন বলতে পারি,

এই যে স্মরণে আছি সেই কি যথেষ্ট নয়?

মধুযামিনীতে ব্রহ্মকমল ফুটুক হিরন্ময়… 



 

পরাগ দোতারা

 

পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসি, ছায়া পড়ে জলে

আনন্দ-সাঁতার ধরে মাছেরা অবাক হয়ে দেখে,

জাগতিক ভ্রম মেখে কাছে আসা আশ্চর্য মানুষ!

 

জলের উপরে উঠে পাখনা নেড়ে ইশারা দেয় কত,

যেন বলে, পড়েছ কি চন্ডীদাস, পদাবলী কথা? 

রাধিকার বিনোদিয়া বিভঙ্গের ঝরে পড়া আলো

দেখেছ কেমন খুঁজে নেয় পরকীয়া বাঁশিটির

ছিদ্রপথ আলোকসম্ভব? আনপথে নূপুরের ধ্বনি 

মিলনের কাঙালপনায় জেগে ওঠা কীর্তনবাসর,

অথবা দেখেছ কোন চর্যার হরিণ,

অঙ্গ বেয়ে ঝরে পড়া নীলাভপ্রণয়?

 

বলি না কিছুই শুধু মাছেদের দেখি, আনন্দ-হ্লাদিনী…

তারা কেউ একাকিত্বে ভোগে না কখনও,

বেঁধে বেঁধে থাকে আর এ-ওর গায়ের থেকে

খুঁটে খুঁটে তুলে দেয় জমে থাকা শ্যাওলা প্রয়াস…

 

পুকুরের জল থেকে ছায়াটি তুলতে গিয়ে দেখি, 

রতিমুগ্ধ বসে আছে সিদ্ধাসনে, কবেকার 

রামী-চন্ডীদাস!



 

পতন 

 

জল পতনেরও একটা মাধুর্য আছে 

যখন তা নেমে আসে বৃষ্টি ফোঁটা হয়ে...

এসময় কিশোরী মেয়েরা এই ভার্চুয়াল সময়েও 

গোপন কুলঙ্গী থেকে বের করে তাদের নূপুর

রাই না হলেও চন্দ্রাবলী ঘোর হয়ে 

নৃত্য করে অনাবিল পিছল উঠোনে...

 

তাদের মায়েরা পুজো ঘর থেকে উঠে এসে দেখে 

মেয়েদের নাচের মুদ্রায় কত বৃন্দাবন গাঁথা হয়ে আছে...

 

অথবা ঝরনা পতনের কথা ভাবো,

মানুষের দৃষ্টি কুড়োবে বলেই অবিরাম নগ্ন থেকে নগ্নতর...

এই পতন পবিত্র বড়, প্রকৃতিগ্রন্থিত

এমন পতনের কাছে ঈশ্বরও পেতে দেয় তার হাত

যেন এক সম্মোহিত অনন্ত কাঙ্গাল...

 

স্নানঘরে জলের পতন নিয়ে কত কবি লিখেছে কবিতা...

মেঝেময় পড়ে থাকা মেয়ের স্নানের জল থেকে 

স্নেহটুকু গোপনে কুড়িয়ে রাখে সুজাতার পিতা…



 

নাচের ইস্কুল থেকে

 

নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসে যে আলোস্রোত

তার নাম ধরে নাও ঘুঙুরবিলাস...

মোহনিয়া রূপ, দেবদারু বন দিয়ে যখন ভ্রমণ 

দেবদাসীরাও উছলিয়া উতলিয়া 

কুড়োতে থাকে তার প্রসব করা শস্যদানা,

ক্যাকটাসের শরীরে বেজে ওঠে পাতাল তরল... 

 

কে এঁকেছ ব্ল্যাকবোর্ডে দাঁত দেখানো ষাঁড়?

শোনোনি অলকানন্দা অথবা গহরজান?

অনুরাগ যেদিন চুইংগাম হয়ে আঁকড়ে ধরবে দিল

আরশিনগর খুব তোলপাড়,

তখন বুঝবে ধনী, বনজ্যোৎস্নার  

আকর্ষের প্রয়োজন তো পড়েনা কোনোদিন...

 

কে এঁকেছ নকশি কাঁথায় হরিণের মাংস উত্তাপ?

নদী যখন বয়ে যাবে নৌকা সোহাগে, তার ঢেউগুলি দেখ,

তারা সব নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসা

এক-একটি পাখি,

যাদের কোনও উপমা নেই

শুধু লিরিক্যাল মুদ্রা আর কত্থকের স্রোত...



 

পাথরের কাছে 

 

পাথরের কাছে যাই 

দেখি, প্রাণ আছে, পাখির কোমল ধ্বনি 

শোনা যায় পাতা হলে কান... 

 

রজস্বলা সমুদ্রের ঢেউগুলি গোপন নির্জন

অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে, যেন

নিজস্ব শিহর পেলে জেগে উঠবে এখনই 

 

সান্দ্র আবেগের থেকে নেচে নেচে নেমে আসে 

শ্যামের বাঁশিটি আর রাধিকা নূপুর...

 

দেখি, এক পথও আছে কুঞ্জের ঘরানা...

 

পাথরও বলেছে কথা, ভেতরমহলে এসো

উট আছে মরুভূমি, কাঁটাগুলি উদ্গাত প্রাণা...