শীলা বিশ্বাসের গুচ্ছ কবিতা

শীলা বিশ্বাসের গুচ্ছ কবিতা

 

ত্রিস্তনী


গ্যালাক্সি পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে অতীত। জন্ম, আকাঙ্খা আর মুক্তি। দৃশ্যগুলি

খোলসশরীর ঝলকিয়ে বাঁশি বাজায়। সেই সব দৃশ্যে রাত পোশাক খুলে ফেলছে

ত্রিস্তনী মেয়েরা। চাঁদের আলোয় ডুবকি আর চুলের ধারা বেয়ে সুগন্ধী। পুং দণ্ড

ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়ালসিল্যুয়েট সাজিয়ে রাখছে পর্দা

 

দৃশ্য ভাঙানিয়া প্রথম স্তন সন্তানের ঠোঁটের ফাঁকে ঘুম গুঁজে রাখে । দ্বিতীয়

স্তন প্রেমিকের মুখে; লীনসঙ্গম কাঠবিড়ালি ঢেউ আর উরুর ফাঁকে সম্ভ্রমদেশ

আরামপুরী। নাভি জুড়ে লালতিল আরতি করে স্পর্শপাখিরা। তৃতীয় স্তন ক্ষমতার

দণ্ড। শক্তিমুগুর খসে পড়ে তাঁহার দেখা পেলে। মাটির যোনি বেয়ে নরম ঘাসের

রতিস্পর্শ, জলের নিক্কণ

 

ধরা দিলেও সে দৃশ্য ছেড়ে দিতে হয়। ডুবে যায় অন্ধকারের ভিয়েন। যুদ্ধ–শাসন-

বীর্যের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে আসে বিষ আর ঘৃণায়। চুল্লীর হাসিতে আহবান।

নাম নিজের সৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলে পুরাণলেখর শৃঙ্গারে নারী দেবী হয়ে

ওঠেন

 

 

চীবরকথা

 

সে এক সন্ধ্যায় তন্তু ও নৈঃশব্দ এক হয়েছিল

ভিক্ষাপাত্রের পাশে রংহীন জীবনের সামান্যতা

তৃণ লতাপাতা বাকল নিয়ে রৌদ্রবৃষ্টিস্নাত

প্রবহমান যশোধরা

পর্দা কী হাওয়ায় উড়েছিল সিদ্ধার্থ?

ফেলে যাওয়া সংসারের ছায়া কি তোমাকেও ঢাকেনি!

কোন আর্যপথ তোমার? কোন পথে গেঁথেছিলাম ত্যাগ?

দেখো গৃহ ও সন্ন্যাসে একই চাঁদ লেগে আছে

 

হৃদয়চিহ্ন আঁকা বোধিবৃক্ষের পাতায়

মায়া ছড়ানো সুজাতার মৃদু জোনাকিহাসি

চামচ থেকে গড়িয়ে নামা শিশির বোধি

শরীরমুখী সিদ্ধার্থের উপবাস ভঙ্গের মোহনভাত

দুগ্ধ চাল জলের অনুপাতে নয়রাত্রি রন্ধন

তন্ত্রমন্ত্র নয়, প্রেমসূত্রের তৈজসে

দেবীর অবশেষ

 

 

যুদ্ধ জার্নাল

 

হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্।

তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ॥

 

যুদ্ধের প্রথম দিনে লক্ষ্য ছিল অসাধারণ

দ্বিতীয় দিন লুকানো বাঙ্কার আক্রমণ

বরফে জমে যাওয়া লক্ষ্যভ্রষ্টগুলি তৃতীয় দিনের ছবি

মৃতদের ছায়া বড় হতে লাগল চতুর্থ দিন

তাপাঙ্কের নীচে বন্দুকের নল পেঁচিয়ে…

স্তব্ধ সেনাদের হাত

 

 

সেনাপ্রধান টুপি খুলে অভিবাদন জানাচ্ছেন—

তবুও কেউ বন্দুক নামায়নি

ধোঁয়ার ফাঁকে এক টুকরো নীল আকাশ ভীত, সন্ত্রস্ত

বাসি ফ্যাকাসে চাঁদ গিলে নিচ্ছে কঙ্কালসার সৈন্য

চিত্রকর একমনে এঁকে চলেছেন আহত সৈনিকদের

 

দৃশ্য আর ছবির ব্যবধানে মৃতরা হারিয়ে যায়

 

যুদ্ধবিরতিতে কার্তুজের খেলা দেখানো অপরাধ

 

গাছের ছায়ায় সেনারা লুকিয়ে

আহত সৈনিকের পোশাক ও অস্ত্র নিরুদ্দেশ

ডানা ভাঙা হেলিকপ্টার —

শত্রুপক্ষের পতাকা ঝুলছে ভাঙা জানালায়

 

চারদিকে ধোঁয়া, বারুদ গন্ধ

 

 

চলন্ত হাসপাতাল এগিয়ে আসছে

ক্ষতস্থানে সেবিকা ব্যান্ডেজ বেঁধে চলে গেলে

তুলোর বৈধব্য মুছে যায়

লাল যোগচিহ্নের উপর

স্নেহ ডাক অনুমোদনহীন বেজে গেল

 

কাঠের পা মালিকের অপেক্ষায় দৃষ্টি ওড়ায়

 

 

একা সৈনিক বিপক্ষ শিবিরে

হাঁটু গেড়ে বসে, আলোর খোঁজে মুখ

রোদটা এখনও পড়ে আছে ঘাসের মাথায়

বেঁচে থাকার আশ্চর্য নিয়ে জীবন চলেছে

একটি যুদ্ধ থেকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে

 

একটি আশ্চর্যের থেকে আরেকটি আশ্চর্যের দিকে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন