শতাব্দী চক্রবর্তীর দশটি কবিতা
নথ
এক শীতকালে তুমি সবুজ শরীরে
কুয়াশার নথ পরিয়ে
চেখে ছিলে বৃক্ষের কোটর, ঝুরি, মূল
শীত শেষে সেই সব ছায়ারা
সবুজ থেকে হলুদ হয়ে ছোট হয়
রোদ বাড়লে তোমার নতুন ডানা গজায়
নথ খসে পড়ে শূর্পনখার
স্বয়ম্বর আয়োজন ।
অনুপস্থিতি
শূন্য কাগজের জাহাজ
হাওয়া ভরা মেঘে পুড়েছে মোহ,
বেড়েছে ময়াল খিদে
জান্তব থাবায়।
এখন প্রতিটি রোদের কণায়
শীতকাল যত্ন দেয় খুব
তরতাজা ক্রীম নতুন ত্বকের ওপর
ব্ল্যাকহোল বন্ধ করে।
পাখিজন্ম
ক্ষেত শূন্য হয়,
বুক থেকে কেটে নেয় তার ধন
গৃহস্থের উঠোনে বসে লক্ষ্মী
নবান্ন গন্ধে আকাশ থমকে পূর্ণিমায়
পরিযায়ী ফিরে আসে পৌষের ঘরে ঘরে।
প্রজাপতি দেখা ছোট্ট মেয়েটি
নয়নে ভ্রমর সাজিয়ে,
পদ্মপাতায় ফড়িংয়ের হাসি মেখে
‘ঐ তো বাবা!’ ডেকে ওঠে
আনন্দে মেয়েটির পাখিজন্ম।
উপকথা
শিবকে ঠাণ্ডা করতে হয়
জল দুধ ঢেলে ঢেলে বেলপাতা ধুতুরা আকন্দে
ঘি মাখিয়ে মসৃণ করতে হয়
কত রাতে ঘিয়ের গন্ধ পাই
কত রাতে দুধের ওল্টানো বাটি
কত রাতে ধুতুরার বিষ নিয়ে
তৃতীয় নয়ন খুলে রাখি।
শিবের রাগেই সৃষ্টি হয় খণ্ড খণ্ড শিব
তাণ্ডবে আমি উজলা হই
রাগ কমে গেলে
ভীষণ রকম ঠাণ্ডা হয়ে যায় লিঙ্গ
শিব তখন খেলার পুতুল হয়ে ওঠে মেয়েলি হাতে
নৌকা
জল ভাগ করে নৌকা এগিয়ে আসছে
অপেক্ষা দাঁড়িয়ে থাকে পাড়ে
উতলা বুকের ভেতর টুকরো হতে থাকে খেদ
সমস্ত দেনা পাওনা মিটিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।
গন্ধের ভেতর লবণ লুকিয়ে ছিল এতদিন
এবার রান্না হবে, সুস্বাদু আহার, পুরুষের ঘ্রাণ!
নৌকার হারানো হাল বয়ে আনছে বছরভরের কামাই
এবার বুকে এসে নোঙর করুক সেবাদাস
কাজলের ছায়া একাই টেনে নিয়েছে চোখে
যেভাবে জল ভাগ করে নৌকা আসছে
সেভাবেই দুই পায়ের ভাগে।
মরণের ওপার হতে
একটি দৃশ্যই বারবার দৃশ্যমান ঐ হাওয়ায়
চমৎকার ছবির মতো ফুটে উঠবে আমাদের ভ্রমণ।
এমন তো কথা ছিল না শ্যাম
ভ্রমণক্ষেত্র বধ্যভূমি হয়ে যাবে?
হাত থেকে খসে পড়বে কামড়ে খাওয়া শেষ আপেল
চোখ থেকে মুছে যাবে সবুজ দৃষ্টি!
আমাদের বয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পরিজনের কাছে
একটি সুখের ছবিই উল্টে পাল্টে দেখে যাবে
একমাত্র জীবিত সন্তানেরা।
দূরের পাইন ফরেস্টের বুনো গন্ধ তখনও ছড়াবে
তখনও জলের প্রপাত হাহাকার করে
ডেকে যাবে আমাদের অস্থিতে,
মজ্জায় রেখে যাবে শেষ হাসির খেয়া।
ওরা মারল আমরা বেঘোরে মরলাম
আমরা শহিদ নই, আমরা যুদ্ধ করিনি
আমরা ভ্রমণে বেরিয়ে বুলেট খেয়েছি দামামায়
তার পরেও নীতিহীন পেশাদারিত্ব দিয়ে কী সুন্দর
আমরা মুড়ে ফেলতে পেরেছি নগর জীবনকে!
আমাদের ভ্রমণ সাঙ্গ হবে না কোনোদিন
বরফ জমা মুখে লেগে আছে অতৃপ্ত শেষ চুম্বন।
যাজ্ঞসেনী
কীভাবে দুঃখ মোছাব তোমার!
শুধু চিৎ হয়ে ভেসে থেকেছি তোমার নাওয়ে
সেখানে দুঃখ দেখিনি কোনোদিন।
ওরা সাঁকো ভেঙে দিল আমাদের ধর্ম চিহ্নে
ভাষার দোহাই দিয়ে ঢেকে দিল সংস্কৃতি।
বিবেক ধ্বংস হয়ে গেলে
ধ্বজা ভেঙে যায় চৈতন্যের
কাদা পাঁকের কীট হয়ে আয়ু খায় তখন মুরুব্বি
ঈশ্বরকে পেড়ে এনে বিধান দেয়
পাঁজরে অস্পৃশ্যতার বাটখারা বসায়।
কীভাবে আর দুঃখ মোছাব তোমার?
তোমার অশ্রু আমারই রক্ত
ওরা ভেঙে দিল বুক, ডানা,
পাখিরাও জানে মরার আভাস লুকানো থাকে ব্যথায়
কঠিন টুকরো বরফের হাওয়ায় ভাসে দুঃখের পালক।
যেকোনো ছলেই ওরা আমাদের ভেঙে দেয়
কৌরব সভাতেও দুই হাত দিয়ে ঢাকতে হয়েছে
এক কাপড়ে রক্তময় শরীর।
মাধবের দয়া মনের ক্ষত ঢাকতে পারেনি
ফাটা বুকে খুঁজে চলেছি নিরাময় এই কালেও
বেহুলার নৃত্য
নদীর ধারে নেতা ধোপানী বসে আছে
গুচ্ছের কাপড় নাইবার কালে কেচে নিতে।
এক মর্ত্যবাসিনী বংশের মান রাখতে এই পথেই আসবে
নিজের স্থল হারিয়ে দুঃখ ভাসিয়েছে যে জলে
তার জন্য স্বর্গের পথ দেখাতে ধোপানী বসে আছে
স্বর্গের খোঁজে ভেলা ভাসানোই যে বেনেবৌয়ের বিধি।
পায়ের ঘুঙুর বেজে ওঠে স্বামীর শরীরের বিনিময়ে
দেবতাদের রসে মজিয়ে দিতে নববধূর লজ্জা ছেড়ে
শব ও সন্ন্যাসীর আদালতে জীবিত বেহুলার স্বর্গ যাত্রা
সদ্য প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের জন্য নিজের আত্মাহুতি,
অনন্য প্রমাণ করতে উল্লসিত হাত কেড়েছে তার আব্রু।
চাঁদ বেনের বংশ রক্ষায় একা বেহুলাই স্বর্গে গেল!
স্বর্গে যাওয়াতেই তার সতীত্ব!
এরপর অমাময় চাঁদের কলঙ্কিত পাহাড়গুলি
কেমন করে তার কচি বুকে এসে ফুল হয়ে যাবে?
ঝরনার জল কি স্বর্গে উঠে গেলে বরফ হয়ে যায়!
মেঘলা দিন
মেঘ করে এলো শহরের ব্যস্ততম সময়ে
ওদিকে প্রেম জমে গড়ের মাঠ, পার্ক স্ট্রিট
আর এঁদোগলিতে জামা-খোলা মুখ
আকাশ ভেঙে থৈ থৈ আঁধার চোখ।
চোখে জল, জলে চোখ মিশে যাচ্ছে
অলেখা চিঠিতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে মেঘের ভুল
দুঃখ বিষ বৃষ্টি ভাগাভাগি শোকে
জেগে আছে বুক
বুকে জেগে আছে তৃষ্ণা ।
নির্জন হতে সমুদ্রে চলে যাবে বলেছিলে
ঘন প্রহর, বালি, রিসোর্ট, সুইমিং, লবণ স্নান পেরিয়ে
আমার দৃষ্টি কেবল অসহায় মুখের দিকেই!
অবাক হও! দোহাই নম্র বুকে এনো না অন্ধ আঘাত
এমনই বাউন্ডুলে শর গাঁথা ভীষ্মের শয্যায়
ভারী গর্জন তুলে ভেঙে দেয় আমার সব বিপন্নতাই
মুহূর্তে ছাই হয় আগুন।
মায়ের কথা
১.
লাল জন্মের দাগ বয়ে বেড়ায় ভাদ্র কুকুর
কানীন শরীরের ঘেউ ঘেউ আপত্তি
কেউ বোঝে না!
দগদগে ঘা নিয়ে গুটিয়ে যায়
শিশুদের ঘ্রাণের ভেতর
পরাজিত লীলা সেজে ওঠে পথে পথে
চক্রব্যূহ জন্মের শোধ।
২.
হাড়ের কাঠি ভেঙে উনুন জ্বালিয়ে
রোগা হাতদুটো রেঁধে বেড়ে চলে
জ্যোৎস্না, চাঁদ, সানস্ক্রিন, ওষ্ঠরঞ্জনী
এসব ছলনা মাত্র অদরকারীও বটে।
শালবনের ঝাটি বাঁধে মাথায়
যদি শূন্য আকাশে শিকার খোঁজে চিল
মাতৃশরীর নিজেকে এগিয়ে দেয়।
কখনো দুর্বল হতে নেই মায়েদের
রক্তে অসীম শেকড়, অনন্ত স্রোত, অটল স্থাপন
খণ্ড খণ্ড দেহ কেবল ভাসমান প্রতিফলন।
ঝিলপাড়, দুঃখজাগানিয়া লাটাই
আমিও বৃক্ষ দেশের শেষ ফুল তাই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন