সুবোধ ঘোষ এর কবিতা

সুবোধ ঘোষ এর কবিতা










একটি চলমান ছবি   

প্রতিটি কাশফুলের নীচে
একটি করে ঢাক নামানো আছে, আর--
ঢাকি ধ্বনি দিয়ে এঁকে চলেছে দুর্গামূর্তি। 
পায়ের তলায় নদী বহে যায় বারোমাস
কারো অনায়াস পারাপার কারো ভিজে কাপড়ের খুঁট
যার পায়ে পথের আলপনা
চোখে ভাত রঙ, সেও নতুন সুতোর গন্ধ শুঁকে। 
যে ছেলেটির পাঁজর গুনে ফেলি এমন উৎসবে
তাঁর কপালে নামিয়ে রাখি ঠোঁট--
বাঙালির উঠোন ভর্তি লোকের মাঝে তাঁর অবাক চেয়ে থাকায়
শিউলি ঝরে যায়।


কক্ষ পথ 

মাথার উপর সর্বোচ্চ জোরে চলছে পাখা
পৃথিবীর গতির থেকে নিতান্তকম, এখন এই ঘূর্ণন দেখে
আমি যদি পাখা টিকে পৃথিবী ভাবি তাহলে
আমি পৃথিবীর বাইরে--
এই যে মধ্য রাত্রি,  নীরবতা ঘণ হচ্ছে পাড়ায়
যেন শ্মশানে বসে রাত্রির স্তব্ধতা মাপছি
যদি ইচ্ছে হয় সূর্য দেখবো তাহলে রাত্রি মিথ্যে হয়ে যাবে
রাত্রি মিথ্যে নয়, ব-কলমে সূর্য আছে অন্য নামে
অথচ বুঝতে পারি আমাকে কেউ ভাঙছে
আমি ছড়িয়ে পড়ছি ঘরে, পাড়ায়
আমাকে খোঁজার জন্য পাখা ঘুরছে
মন খারাপ করে  বসে থাকছে পাড়া
আমি দেখেছি সারাদিন যত ছায়া ফেলেছি
রাত্রিতে তার চিহ্ন থাকে না।


ঝরা পাতা ও আগুন

পাতা ঝরে ঝরে যেভাবে মাটি গোপন করে
তা সহ্যের বাইরে
মাটির বুকে পা তুলে এমন শুয়ে থাকে  যেন
এর জন্যই তাদের ঝরে ঝরে আসা। 
আমি রোজ তাদের এক জায়গায় করে
মাটিতে  হাত রাখি--
ওদের কোন শরীরী উষ্ণতা পাইনা
বরং দিন দিন হাড় মাস আলাদা হতে থাকে
ততদিনে বোঁটায় দুধ শুকিয়ে গেছে  , 
এমন ই একদিন ভাবি ওদের গা থেকে
মুছে গেছে গাছ গাছ গন্ধ
আগুন দিই, জ্বলে ওঠে, ছাই হয়ে যায়
বাতাসে যখনই উড়ে ছাই, দেখি
মাটিতে গাছের ছায়া পড়ে।


মাছ 

তুমি টেবিলে সমূদ্র নামিয়ে রাখো
মাছ খেলা করে, চুমু খায়, ঝগড়া করে
পাথুরে বিছানায় হেঁটে যায় ---
বদ্ধ জীবনের ঘৃণা ছুঁড়ে দেয় জলের উপর মুখ তুলে
কিছু জলজ উদ্ভিদ  স্থির থাকে, তার
আড়াল থেকে  টিপ্প নী দেয় ঠোঁট বাকিয়ে
এ সবের কোন ধ্বনি তোমার কানে যায় না। 
কোনদিন কান পেতেছো কাঁচের দেওয়ালে? 
মাছেদের আকাশ নেই
সূর্য নেই, নেই চাঁদ, তারা--
বৈদ্যুতিক বুদবুদে ওরা শরীর সেঁকে নেয়। 
মরা ঝিনুকে ঠোক্কর মেরে আয়ু বাড়ায়, তবু
একবারও  দেওয়াল ভেঙে মুক্তি র স্বাদ জাগে না


মোমবাতি ও দেশলাই                       

যে বৃষ্টি ছাতা কে প্রত্যাখ্যান করে
চলো তার মাঝে দাঁড়ায়-
হাতের উপর হাত থাক, চোখের ভেতর চোখ। 
জমে  থাকা জলে ফুলে ওঠা বৃষ্টির অবাক চোখ
হিংসায় ফেটে যাবে--
যে ভাবে মত্ত থাকে মানুষ ছায়ার ভেতর
তারা  আমাদের ওতোপ্রতো ভেসে থাকা
দেখতে দেখতে বুঝে যাবে ঠিক--
হাড় ও মাংসের  মূলত কোন ওজন থাকে না
যা থাকে ,তা নদীর গভীরতা।


সমূদ্র সৈকতে


আমার বাড়িতে মা নামে কোন সিন্দুর কৌটো নেই
পাশ ফিরে শুয়ে থাকা নদীর বিছানার চাদরের মতো
মায়ের সিঁথি--
মায়ের চুড়ির কাছে
পৃথিবীর সকল ধ্বনি কে নতজানু হতে দেখেছি। 
কাপড়ে এখন ফুল ফোটে না মায়ের, রঙ ধরে না
সব রঙ দুরন্ত ঘুর্ণনে এক হয়ে মায়ের কাপড়ে লেগে থাকে--। 
মা হাসে, তবে সব দাঁত বেরোয় না
মা চুল বাঁধে  বড় বড় শ্বাস টেনে
হাওয়ার চাইতে দীর্ঘ শ্বাসে বেশি চুল উড়ে। 
মাঠের এক প্রান্তে মা শুয়ে থাকে, সারা মাঠে বাবার পায়ের ছাপ--
যতবার পাশ ফিরে শুন্যতা ঠেকে হাতে। 
লন্ঠনে এত কিছু লুকিয়ে রাখে মা
আমি দেশলাই গোপন করি--


বুনন


তারপর তুমি পাশ ফিরে শুলে
আমি তারপরও জেগে আছি, মধ্যরাতের নাভি ছুঁয়ে
একটু একটু করে ঘুম জমলো তোমার শরীরে
তুমি আরো অসহায় হয়ে পড়ছো--ভাবটা ঠিক
এক পাখি নিরাপদ হীন ভাবে ডেকে উঠলো
তুমি চিৎ হলে--
পাখি তোমাকে দেখেনি
আমি পাখি দেখিনি
তবু কেমন যেন মানুষ, পাখি, রাত, ঘুম
খুব সুতোয় সুতোয়
তুমি আবার পাশ ফিরলে
আমি রাত্রি কে ঘুমিয়ে যেতে দেখলাম
ঠিক আমার মতো, তোমার মতো।


বন্ধু


তোমার বুকের পরিমাপ না জেনেই
বন্ধু বলেছি-
এর আকার কিছু না থাকলেও আয়তনে বিশ্বময়
বুক ও ঠিক তাইই, ছড়ানো প্রান্তর অন্তহীন। 
বন্ধু শব্দটি অন্যের কাছে মানানসই, তাতে গর্বের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে--
বুকের ভিতর এক সাগর 
লুকানো রতনে নিজেকে ধনী বোধ হয়। 
লুঠ ছুঁড়ে বিবস্ত্র করতে পারো
চোখ থেকে নিঙড়ে নিতে পারো আলো
জীব থেকে কথা কেটে নিলেও
বুক থেকে সাগর সরানো এতটা সহজ নয়
যতো বার সরানোর ছলে রাখবে হাত নীচে
ততবারই পৃথিবীর ভারসাম্য ভুলতে থাকবে তোমার পা।


ছেঁড়া বালিশ ও গান


পূর্ব প্রান্তের  কোণে এক শিশু
বালিশ ছিঁড়ে তুলো উড়াচ্ছে
পশ্চিম দিকে উড়ে যাচ্ছে তুলো, তাঁর--
এই যাত্রাপথ কে নাম দিয়েছি শরৎ। 
নদীও নাছোড়, সেও চেরা পাতার মাঝে
শক্ত কাঠিতে তুলো গুঁজে
ইচ্ছে মতো ঢেলে দিচ্ছে হাওয়া। 
এসব ঘটনার মাঝেই মানুষ  দশকর্মার দোকানে যায়
পুঞ্জীভূত  রঙীন সুতোয় শরীর ঢেকে ধূপ জ্বালবে বলে      । 
দূর্গা রঙের বোঁটায় যে ফুলটি জায়গা দখল করে
তার চোখে জল দেখেও 
ফুটপাতে র শিশুটি  আধো আধো গলায়
থালা বাজিয়ে গান করে।


পা


পা যদি পথ লোভি হয়
দূরত্ব ভুলে যাওয়ায় দোষ নেই
এভাবেই মানুষ তো মানুষের কাছে আসে
মন থেকে আসে নিজের মতো। 
বহুদিন যেন পায়ের কোন লোভ নেই
ডান পায়ের সাথে বাম পায়ের কথা হয়না
ব্যাটারী চালিত পুতুলের মতো তাদের চলন ভঙ্গি
একটি মানুষ থেকে আরেক মানুষের মধ্যে
অনেকখানি পথ--
চলাচল বন্ধ হলে যেভাবে গজিয়ে ওঠে ঘাস, আগাছা
আগামী দিনে এ পথে পা রাখতে সাপের ভয়ে 
পিছিয়ে যাবে মানুষ 
ক্রমশঃ পা  পথের লোভে চঞ্চল না হতে হতে
চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে দেখবে
পা ছাড়াই মানুষ কেমন অন্তহীন যাত্রা য় চলে যায়।

২টি মন্তব্য:

  1. সুবোধ ঘোষ তার কবিতায় খুবই আন্তরিক এবং সৎ। কবির দৃষ্টি ভিন্নতর অথচ সহজ।

    উত্তরমুছুন
  2. পাঠক হিসেবে কবির কবিতাগুলিকে মনে হয়েছে জীবনের এক একটি মোটা দাগ । অনেকের কবিতার শব্দ তো অর্ধেক প্রকাশ করে, অর্ধেক গোপন করে ।কবি সুবোধ ঘোষের কবিতায় সব শব্দই প্রকাশোন্মুখ ।

    উত্তরমুছুন