শক্তিপদ পাঠক-এর কবিতা
শীতঘুমে আছি
সারারাত ঘাসের উপর শিশিরের কণা জমে।
এই অনন্ত শীতরাত্রি, ঘনীভূত চাঁদ,
বুকে তার দূরগামী পাতাঝরা বন।
হলুদ পাতার নীচে জমে থাকা শীতঘুম
আমাকে নিবিড় করে কাছে ডাকে।
মাঠের গর্তের মধ্যে মেঠো ইঁদুরের
চুরি করা ফসলের ভাগ
যে সব ছেলেরা নেয়, তাদের বারণ করো।
আহা! সব জীব বেঁচেবর্তে থাক।
আমরা সবাই তো একদিন
শিমুলপাতার মতো ঝরে যাবো শীতের বাতাসে।
তাই যত পারো ওম দাও,
মাঠে মাঠে ভালোবাসা দুহাতে ছড়াও।
শীতঘুম থেকে যেন জেগে দেখি
আবার নতুন পাতা ভরে গেছে সব গাছে গাছে।
প্রেমময়
ঐ পথ কাদায় পিছল,
ও পথে তোমার যাওয়া মানা।
পতনের ভয় মিশে আছে,
ও পথের চোখ নেই, কানা।
এই পথ সোজা গেছে ঘরে,
পিচঢালা, খানাডোবা নেই।
দুইপাশে নুয়ে পড়া গাছ,
সাদরে ডাকছে তোমাকেই।
চোখের পাতায় জমা ঘুম,
নাকের পাটায় তিলফুল,
আমাকে অবশ করে রাখে,
হয়ে যায় সব কাজে ভুল।
আমি তাই ভুল পথে যাই।
কাদাকে ঘাসের মাঠ ভেবে
শুয়ে আছি জমে থাকা জলে,
আমাকে কি ঘরে ডেকে নেবে?
ঘরের মেঝেতে লেপা ছায়া,
ছায়ার গভীরে লেখা নাম,
নামের অতলে আছে প্রেম,
প্রেমময় তোমাকে প্রণাম।
জীবন
জীবন কিছুই নয় - একটি প্রদীপ,
তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে রাখা শুধু।
হাওয়ার ঝাপট থেকে দুহাতে আড়াল করে রাখি।
পাছে যদি নিভে যায় এই ভেবে সচকিত থাকি।
মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে আগুনের শিখাকে কাঁপায়,
তুমুল মুষলধারে বৃষ্টি নেমে
আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়।
সলতে ফুরিয়ে গেলে একদিন শেষ হবে জ্বলা,
আঁধার লুটাবে পায়ে, শেষ হবে সব কথাবলা।
ভয় হয়, এভাবেই মুছে যদি যাই,
তার আগে আমি যেন একবার
তোমাকে নিবিড়
করে পাই।
আহত সৈনিক
পিছনেই থাকি।
তোমরা এগিয়ে যাও অভ্ররেণু,
বিনত ডালের সঙ্গে দোল খাও।
অনেক দূরের পথ, পাহাড়িয়া গ্রাম।
উঁচু উঁচু টিলার ভিতরে
মেষচারণের ফাঁকা মাঠ।
ঘাস আছে, টলটলে জল আছে।
ওখানে রাতের শেষে অনুপম ভোর,
ওখানে দিনের গায়ে মখমলি রোদ,
ওখানে নাচের পায়ে উতলা ঘুঙুর,
নিবেদিত কথাগুলি সেইখানে
প্রাচীন গুহার কাছে রেখে এস।
আমি আর সামনে যাবনা।
আমার পায়ের পাতা
বেঁকে গেছে স্থলিত বিষাদে,
ইচ্ছা সব মরে গেছে।
এরকম পরাঙ্মুখ মন নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?
আত্মশুদ্ধি
বেলা হল,
এবার নদীর ঘাটে স্নানে যাও।
বুকজুড়ে চ্যাটালো পাথর,
যা কিছু অর্জন আছে কাচাকাচি করো,
জলে নেমে ঠান্ডা হও, ঢেউ মাখো।
তোমার পায়ের তলা পথের উত্তাপে পুড়ে
কালো হয়ে গেছে,
ফোস্কাপড়া চামড়ার ভিতরে জমা দাহরস,
এখানে জলের মধ্যে তারও জেনো
নিরাময় আছে।
স্নান সেরে ধীর পায়ে উঠানে দাঁড়াও,
চেয়ে দেখ, ধোঁয়া ওঠা ভাত
এখনও তোমার জন্য অপেক্ষায়
আছে।
আকাঙ্ক্ষা
অপরাধগুলি মাটিতে নামিয়ে রাখি,
পোড়াব যে, সে সাহস নেই।
এখন আমার দেহ পালকের মত
আলগা বাতাসে ভাসে।
এসো ঝড়, আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাও।
পাথরের মত ভারি পাপগুলি
যেন না পাঁজরে উঠে আসে।
পাতালছায়া
ঘরের পাশেই ঘন বাঁশঝোপ,
ঐখানে পেঁচাদের বাসা।
রাতের শিকার সেরে দিনের বেলায়
ঘুমঘুম চোখে নামে হিম ভালবাসা।
কুটুসের ফুলগুলি তারার মতন
ফুটে থাকে আঁকাবাঁকা পায়েচলা
পথের দুপাশে।
উইয়ের ঢিবির থেকে খরিসের ছানাপোনা
ভুল করে ছায়াছায়া দিনের
আলোয়
বাইরে বেরিয়ে
চলে আসে।
ওইখানে বসে থাকি বাঁশের মাচায়,
তখন তোমাকে মনে পড়ে।
আকুল শিকড় নামে পাথরের কোল ঘেঁষে
মাটির গভীরে, অটল দাঁড়িয়ে থাকে গাছ,
আমাকে উড়িয়ে নেয়
ঝড়ে।
পাক খাই লাট খাই ধানক্ষেতে মাঠে,
ছেঁড়া সুতো, কার হাতে স্থবির লাটাই!
পেঁচার ঘোলাটে চোখে ঘুমঘুম ভালবাসা,
খরিসের বিষদাঁতে ফোঁটাফোঁটা ঝরে পড়া
মুক্তোর দানার মত বিষ বুকে নিয়ে
আবার তোমাকে পেতে চাই।
স্বপ্নে দেখা বাড়ি
তোমাদের বাড়ি যাব বলে
সেই ভোররাতে বেরিয়েছি,
পথ খুঁজে পাইনি এখনও।
দু কদম না যেতেই
গমক্ষেত শীষ নেড়ে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে,
গোপনে ভাংচি দেয় - এইভাবে যেওনা কখনও।
নদীর জলের নীচে রুপালি মাছেরা নাচে,
নাচ দেখি, ঢেউ দেখি, শস্যের সবুজে দেখি মায়া,
দুপুরে প্রখর রোদে বটপাকুড়ের গাছ
মাথায় বিছিয়ে রাখে ছায়া।
বিকেলে নরম আলো
ভালবাসা ঢেলে দেয় পাখিদের গানে,
পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে খিদে পেটে বসে পড়ি
জীবন আমাকে ফের বাস্তবের দিকে টেনে আনে।
নিজের ঘরের কাছে ফিরে আসি ফের
কেউ এসে ডাক দেয় -
তোমার অদেখা বাড়ি বহুদূর
যাব ভাবি - যেতে চাই,
যাওয়া তবু হয়না
কখনও।
বিরহ
রাস্তার দুধার জুড়ে রাধাচূড়া গাছে
তোমার গালের স্নিগ্ধ কোমলতা আছে।
আমি তাই বসে থাকি পথের উপরে
যদি কোনো ফুল ঝরে পড়ে।
তোমার চুলের গন্ধ বয়ে আনে প্রেমিক বাতাস।
বেদনামথিত দীর্ঘশ্বাস
ছুঁয়ে যায় আমাকে সহসা,
মনের গোপন ঘরে আলো জ্বলে, আলো নেভে,
বিস্ময়ে হারিয়ে ফেলি ভাষা।
তুমি এক আলোর প্রতিমা।
তোমাকে খুঁজতে গিয়ে পার হই ম্লান দৃষ্টিসীমা।
তবুও হয়না কাছে পাওয়া,
তোমাকে উড়িয়ে নেয় ভিনদেশি দূরগামী হাওয়া।
আশা
একদিন সবকিছু ফিরে পাব।
নিকানো উঠানভরা ধানের মরাই,
কাগজিলেবুর গাছে শালিকের বাসা
আর খিড়কি পুকুর।
মাটি খুঁড়ে লুটে নেওয়া সোনার মোহর ফিরে পাব।
গোয়ালে আবার কালো নতমুখী গাভীটির
নতুন বাছুর হবে।
কেন্নো, কেঁচো, হেলেসাপ এখানে ওখানে ঘুরে
ফিরে এসে জীবনের কাহিনী শোনাবে।
ক'টাদিন কষ্ট করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাক।
বেড়া দাও চারপাশে, খড়িমাটি গিরিমাটি গুলে
দেওয়ালে শিশুর মুখ আঁক।
এখন অশান্ত স্রোত শক্ত করে ধরে থাকো হাল,
রাত ঠিক কেটে যাবে, আলো নিয়ে আসবে সকাল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন