লাকী চট্টরাজ - এর কবিতা

লাকী চট্টরাজ - এর কবিতা

 

তুমি তো দেখো না

হেমন্তে ছাতিম সন্ধ্যা বড়ো মায়াময় 
চাঁদের আলোয় 
তুমি তো দেখো না এইসব,
নিস্তব্ধ দুপুরে কামিনী রায় আর দিন চলে যায়’’
এর মাঝে ক্ষণিকের মগ্নতা তোমার ভালো লাগেনি,
বোঝনি সুখ কী, স্বস্তির নিঃশ্বাসই বা কী!
তুমি তো বোঝো না সেইসব,
সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল, 
বলেছিলাম চলো দুজনে একসাথে গাই,
শোননি সেদিন, অবাস্তবের  পাহাড় ভেবেছিলে;
অথচ সেটিই ছিল আমার পরিণত ভালোবাসা 
আজো আমি গান গাই, কবিতায় ডুবে যাই, বৃষ্টি দেখি,
ছাতিম গন্ধে বিভোর হই, 
আর আকাশ দেখি পূর্ণিমা রাতে...


অন্য হেমন্ত 


ভেবেছিলাম হেমন্তের একটি সন্ধ্যায় 
আমার কবিতার জন্য হিমঝুরি হয়ে আসবে,
ছাতিমের গন্ধ হয়ে আসবে 
তুমি এলে কই?
আমি একা একা হেমন্তের বিকেলে পড়ন্ত রোদের গল্প শুনলাম, আকাশের বুকের ওপর শুয়ে থাকা ক্ষীণ আলোয় মন ডোবালাম
তুমি এলে কই ? 
ইচ্ছে ছিল ঐ কমলা আভা মেখে , কল্পনার নদীঘাটে কাটিয়ে দেবো  তোমার কণ্ঠে ধায় যেনো মোর সকল ভালোবাসা শুনতে শুনতে 
তুমি এলে কই?
তোমার অনুপস্থিতি আর পার্থিব নৈঃশব্দ্য 
বড়ো বাঙ্ময়, অন্য হেমন্ত, কবিতার কাছাকাছি.....

 

দৌড় 

স্মৃতির পথে হাঁটতে গিয়ে দেখি 
আমার শৈশব আসর ছোঁওয়া শপথের আহবানে 
সাতগুঠি আর বুড়ি বসন্তে,চু কিতকিত, লুকোচুরিতে 
আমার শৈশবটা ছিল লেবু দৌড়, বস্তা দৌড়, অঙ্ক দৌড়ে 
দৌড়েছি মিটারে, কিলোমিটারে,
এখনো দৌড় আছে, সন্তানের জন্য অভিভাবকদের 
ইঁদুর দৌড়,একে অপরকে ঠেলে
পালিয়ে যাওয়ার দৌড়,
আমাদের ছিল শৈশবের বিকেল আর সবুজ মাঠ
বাস্তবে ফিরে দেখি
বিপন্ন শৈশবে আমার দীর্ঘশ্বাস
আমরা পারিনি শিশুদের বন্ধু বৃত্ত তৈরি করতে
শুধু ওদের সরল জীবনকে করেছি জটিল,
শরীর আর মনের স্বাস্থ্য গঠনের দৌড় আর
পৃথিবীকে সবুজ দেখার দৌড় থেকে
বঞ্চিত করে, সবুজ শৈশব কেড়ে নিয়ে....

 

সময়ের ছাপ

কুঁড়ি থেকে প্রস্ফুটিত গোলাপ
শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি 
সময় শুধুই ফেলে যায় তার ছাপ...
দারুণ দহনবেলা থেকে কৃষ্ণচূড়ার কলি আসা
সময় করেছে বন্দি, আমরা তার সাক্ষী
বর্ষার মেঘে সময় এঁকে চলে একলা ঘাটের
তরী ভাসানোর গল্প, কখনোবা কলাভবনের ভাস্কর্য
সময়ের বুকে সোনালী ধান করে কলরব,
ঝরাপাতারা শুভেচ্ছা জানায়, মাঠের বাঁশি শুনতে শুনতে
উৎসবের আয়োজন সেরে ফেলে..
হৃদয়ের বসন্ত আসে একতারাটির তারে
দূর থেকে ভেসে আসা সুরে মন ভাসাই..
আমার ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো” ….


আলো দৃষ্টি 
 
সেদিন  জঙ্গলের  একটি রঙিন প্রজাপতি
দার্শনিককে নিয়ে যায় 
একটি শুঁয়োপোকার কাছে
দশমীতে জলে ভাসমান মা দুর্গার মুখ
মনে করিয়ে দেয় 
ষষ্ঠীর বোধন আর সেই ঘাম তেল
বটগাছের নিচে বসে ভাবনাতে আসে 
অঙ্কুরিত দুটি সবুজ পাতা 
বোধ আর দৃষ্টিভঙ্গির মিলনমেলায় 
চেতনার খোলামেলা আলোচনা 
শ্মশানে সারি সারি শবের মধ্যে একজোড়া দম্পতিও
আলাদা আলাদা চিতার আগুন 
এসেছি একা যাবোও একা এমন বিজ্ঞাপন 
আগুনে আগুনে
সবটাই বাস্তবতায় মোড়া নির্ভেজাল দর্শন...


তেজপাতা 
 
যেদিন প্রথম শাড়ী কবিতাটি পরি বোধের সিঁড়িতে যেনো পা রাখা আমারকবিতার ভেতর থেকে নিংড়ে নিতে ইচ্ছে করেছিল আকাশী রংটাকবির কলমের আঁচড়ে তেজপাতার রঙে হেঁটেছিল আমার দীর্ঘশ্বাসশাড়ির সমগ্রতায় বাঁচাও শব্দের ভেতরে দেখেছি পোড়া মনুষ্যত্বের ধোঁওয়ামনের ভেতরে তোলপাড় করা আস্থাহীনতা আর নৈরাশ্যের ঝড়যে ঝড়ে খুঁজে পেয়েছি কবিত্ব বোধ, ছয়তলার বারান্দা আর নিচের পৃথিবীর সুস্পষ্ট ছবি

 
খোলা জানলা 
 
কবিতা তোমার ডাক নাম দিলাম ভালোবাসা
সে আমার বুকের বামদিকে 
ঘুরে ফিরে বেড়ায়,
তোমার জন্য শব্দেরা মানিব্যাগে থাকে না। 
খরচে কার্পণ্য করিনা,
তোমার সমালোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণে এক বুক নদী বয়ে যায়... 
অথচ তুমি থাকো পালপাড়ার এঁটেল মাটির মতো নরম
 
তোমাকে নিয়ে বাঁধাধরা শব্দ আর কিছু নিয়ম তৈরি হয়,
অথচ তুমি থাকো, পাহাড়, নদী, ফুলে,
তুমি থাকো ব্যথা, আনন্দে আর চিরচেনা আলপথে অনাবিল
ব্যস্ত থাকো সময়ের হাত ধরে  মুহূর্তকে জাপটে ধরবে বলে
তোমাকে জড়িয়ে সত্যেরা হয়ে ওঠে স্পষ্ট, 
খুঁজে পায় আত্মক্ষরণের বিশুদ্ধ কালি
মাঝে মাঝে তোমার ডাক নাম নিয়ে ভাবি...
খোলা জানালা? 
কবিতা তুমিই কি সেই উদার, 
দিগন্ত দেখতে পাওয়া ভালোবাসার... 
খোলা জানালা?

 

বসন্ত ( তিন) 
 
সাদাকালো ছবির ভেতর 
বসন্তের গানের স্বরলিপি আজো আছে জেগে, 
পুবের দরজা খুলে দেখি কাঁটা তারে আটকে আছে 
অজস্র বনজুঁই,
পশ্চিমের দরজা খুলে দেখি বোগেনভিলিয়া
দেয়ালের গায়ে দুলছে,
সাদাকালো ছবির ভেতর
এখনো ছোটাছুটি করে খোঁপাতে কাঠগোলাপ নেওয়া
সেই উনিশের মেয়েটি ,
দক্ষিণের জানালা খুলে মুখে চোখে বাতাস মাখতে চায় ,
সাদাকালো ছবির ভেতর
বেবাগা মন খোঁজে শালপিয়ালের বন...

 
ভালোবাসা কারে কয় 
 
তুমি গাছের পাতায় 
কবিতা লিখতে পারো?
না না পারিনা 
তুমি খাতার পাতায় জলরঙে ছবি আঁকতে পারো?
না তাও পারিনা,
তুমি দুখ জাগানিয়া অথবা ঘুম পাড়ানিয়া 
গান গাইতে পারো ?
সে কেমন গান জানিনা তো
তাহলে কী পারো তুমি?
আমি পাতার রঙে নিজেকে ডোবাতে পারি
মনের খাতায় একটি হলুদ বসন্ত দিতে পারি
গানের সুরে চোখ বন্ধ করতে পারি
আঁধার রাতে একটি জোনাকি হতে পারি 
আর আর...
তোমার অগোছালো, এলোমেলো ভাষাকে 
আমার ভালোবাসার আলমারিতে 
যত্নে রাখতে পারি  
 
 
   
কবিতা কুটির
 
মাটির উঠোন, চালে শুয়ে আছে পুঁই,
বাঁশের বেড়াকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা শিশু লাউ এর
টিনের দরজার ওপর থেকে ঝুলে পড়েছে মাধবীর ঝাড়,
লাতা দেওয়া উঠোনে নয় মাসের শিশুর হামাগুড়ি
গুগলীবেচা শান্তি মাসির সরল হাসি,
সরলতা আর পবিত্রতা মিলেমিশে একাকার...
ফুলমনির দুধে দাঁতের হাসিতে 
কুটির হয়ে ওঠে আলোকের ঝর্ণা,
ওরা ভালোবাসা দিবস জানেনা,
জানে ভালোবাসা, জানে ভালোবেসে
রোগের উপশম ঘটাতে

 
বোধ যখন স্পর্শ করে 
 
বারো বছরের মেয়েটি জানতোনা 
অমৃতলোক কাকে বলে, 
বাবা,মা আর পিসির সাথে পুরী ভ্রমণ,
স্বর্গদারের কাছে যেতেই বাবার হ্যাঁচকা টানে 
মেয়েটি বাঁ দিকে ডান দিকে চলে,
আগুন জ্বলছিল, কৌতূহলী মেয়েটি থমকে দাঁড়ায় 
কুড়ি বছরের মেয়েটি 
মধুচন্দ্রিমায় যায়, সাগরের লোনা জলে গা ভাসায়
পুরোনো ছবির অ্যালবাম থেকে জেগে ওঠে 
শৈশবে দেখা আগুন আর কাঠ ফাটা শব্দ 
আটকে যায় দুটি পা আর কৌতূহলী মন ও
স্বামীর ভালবাসা আর আবেগ 
এক মুহুর্ত দাঁড়াতে দেয়নি সেখানে
পঁয়তাল্লিশ বছরের মেয়েটি 
স্বর্গদ্বারের  দরজার সামনেই,
সে জানে অমৃতলোক কী, না ফেরার দেশ কেমন হয়,
সে জানে ঐ আগুনের মানে,
সে জানে আছে দুঃখ,আছে মৃত্যু 
বিরহ দহন লাগে
...
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন