সুমিতা মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
প্রতিশোধের টিয়ার
তুখোর দিনের প্রতিশ্রুতি যদি আবেগতাড়িত করে -
খসখসে বাস্তব, শ্রান্ত ঘাম-জলে ভিজে যাওয়া ইচ্ছা,
মেঘলা মনের ডানায় না ফেরা ঠিকানার চাওয়া,
কিংবা অনেক হেঁটেও না পাওয়া পথ-
যদি রঙধনু এঁকে দেয় শ্রাবনের আকাশ।
কসম চান্দাদিঘী, সদ্য বিধবা বটতলা-
আজন্ম সমান্তরাল বয়ে চলা, ওহে রেললাইন!
ভেবে নিবো-তুমিই আমাকে ডাকছো,
স্মৃতির আঙিনায়।
ধুলো জমা রাজপথে ভুল করা শপথ!
আত্মার ফুঁৎকারে হিংসার মরিচগুড়ো,
প্রতিশোধের টিয়ার, বারুদের গন্ধ, অথবা
দ্রোহের চিৎকারে যদি গর্জে উঠে প্রান্তর, শ্লোগানে
প্লাবনে
ভেবে নিবো-তুমিই আমাকে ডাকছো,
মিছিলের সীমানায়।
ভুল ফুল বুননে-জোনাক মালা স্বপ্নের আকুতি,
দুপুর না হতেই, সন্ধ্যার আঁধারে ঝরে যাওয়া গোধূলি
বিকেল
তার আঁতুড়ঘরে পুড়ে মরা বেঁচে থাকা-
কান্নার রঙে ধুয়ে যাওয়া প্রেম,
যদি আলো হাতে ফিরে আসে, এ আকাশ আঙিনায়।
ভেবে নিবো, তুমিই আমাকে ডাকছো-
শোকের মিছিল নয়, দ্রোহের প্রলয় মশালে
সে আলোর দ্রোহে, নিষ্পাপ আকুতির কলিজার মতো
প্রনয়ের নৈবদ্যে মুগ্ধতায়,
অবেলার গোধূলি-আর তার ফিরে যাওয়া জোছনায়...!!!
বানভাসি
অযাচিত জল নেমে গেলে
বিবস্ত্র এই বানভাসি হৃদয়ের
পাঁজরে লেগে থাকে হাজারো দুঃখ গাথা
ছিন্ন কলমীলতা আর জলজ। ফুলের আলপনায়
মেদুর এই ক্যানভাসে আঁকা হয়
প্রাচীনতর কোন এক মেঘলা দুপুর।
সাঁকো পেরিয়ে ছোট্টবেলার আকাশ,
শতাব্দী পুরোনো শালিকের ঠোঁট
বিগত দিনের পেলব সন্ধ্যা খুঁটে খুঁটে খায়,
কীচক কান্নার মতো ধূসর মনকথা আর
উঠোন জুড়ে জীবনের জলছাপ;
গোপন অক্ষরে লেখা হয়
অন্তরঙ্গ কিরার ইতিকথা যত।
বেয়াড়া বৃষ্টির কথকতায় রাত বাড়ে,
কচি কলাপাতা রঙের বউ
আজ জাগরী ভীষণ,
অনিবার্য বেদনায় বুকের কিনারে জমা হয়
সব হারানোর গান
এই সব শব্দ শবের মান্দাসে বুঝি
ভেসে যায়
আরো এক বিপন্ন বর্ষাযাপন।
চুম্বন
জেগে উঠি অবিবাহে জেগে উঠি রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে পৌষ
মাঘের
প্যাস্টেলের বারো রঙে জেগে উঠি বোমা বিস্ফোরণের শব্দে,
আর কী আশ্চর্য এতদিন আমি
অখণ্ড গীতবিতানের প্রেক্ষাপটে
মজে ছিলাম কেমন অনন্তের বাণী আর মাধুরী উৎসবের ঠিক মাঝখানে
একটি নিঃশ্বাস রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম প্রেমিক প্রেমিকার
মতো রোজ
হাতে রক্ত মুখে রক্ত জেগে উঠি আর আর
কখনো জেগে উঠব না ভেবে।।
কুটিল ঘূর্ণিঝড় থেকে টেনে নাও
চুম্বকের মতো
তোমারই একান্ত সম্মোহনী চুম্বনে।।
নশ্বরতা
পোশাক পরার মত সহজ অভ্যাসে
বিভিন্ন ভূখন্ড থেকে জীবনকে দেখে যাই,
মাঝে মাঝে সফল রোদ্দুরে দেখা যায়
বেদনা ও ধুলোর প্রবাহ!
পৃথিবীতে অবিরত রসনা সংযত করে যে পরিবেশন করে -
তাকে দিন কখনো বা রাত্রি মনে হয়,
উৎসে পৌঁছে লক্ষ্য করি -চতুর্দিকে ব্যাপ্ত নশ্বরতা;
সফল প্রয়াসে তবু সকল জাহাজ বন্দরের দিকে যায়.
চোখ যা থেকে উৎসারিত সৌন্দর্যের মৃত্যু হলে
বাতাসে করুণ এক অভিনয় চলে,
পাতা কি কখনো বোঝে ফুলের আতঙ্ক?
আশ্চর্য সংশয় শুধু সব দিকে সব পাতা দোলে।।
বর্ণপরিচয়
গত সাত বছর সকাল থেকে সন্ধ্যে হন্য হয়ে আমি
সত্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম সম্প্রতি কাগজে জানলাম
লেকের ধারে তরুণীসহ উচ্ছৃঙ্খলতার দায়ে ধরা পড়ে
সে নাকি এখন হাজতে আছে
বিদ্যাসাগর মাতামহ কি ভয়ংকর কান্ড. দেখুন
এই আন্তর্জাতিক মহিলাদিবসে ‘বর্ণপরিচয়’ দ্বিতীয়
ভাগ
থেকে পালিয়ে সত্য বেমালুম লম্পট হয়ে গেল
আপনাকেও কিছু না জানিয়ে
তালতলার সেই প্রসিদ্ধি বাদামি চটিপায়ে একটু
তাড়াতাড়ি নেমে আসুন গোলদীঘির বেদি থেকে
আদালত যেতে হবে জামিন তদ্বিরে তা নাহলে পুলিশের হাতে
সত্য বেচারা বেঘোরে মারা যাবে।।
রূপান্তর
বোবা পাথরেরা কথা বলছে,
বোবা মেঘেরা নীরবে হাসছে।
আর, সকল রাত্রির শেষে,
মৃত্যু আলো হয়ে, অন্ধকারে ভাসছে।
পৃথিবীর
পল্লবিত শাখায় - শাখায়
অনেক রৌদ্রসফল রূপান্তর দেখে,
আলোকের অলীক বিন্যাসে
নিয়তিকে আগুন জেনেছি।
প্রস্তুতি তো ছিলই, তবু
মূর্ত আকস্মিক ধ্বংস সংসারে;
একবগ্গা খেয়াল কি আর বাঁচাতে কিছু পারে?
চারিদিকে পড়ে থাকে সমস্ত ভঙ্গুর......
শুধু একটা কোথাও না পৌঁছানো
খুব উঁচু সিঁড়ি দাঁড়িয়ে থাকে
আকাশের দিকে মুখ করে -
আসছে বসন্ত ।।
ম্যারাথনের দৌঁড়
মিথ্যেমিথ্যি অমোঘ কিছু কথা, হাজার কথা রাখার ঘোরানো
সিঁড়িদের হারানো - প্রাপ্তি -নিরুদ্দেশ অথবা, অন্য গ্রহ থেকে চলকালো ধূমায়িত রোদের
মুখ চিরে কেমন ম্যারাথন রাত্রি
একা একা মশাল নিয়ে যাওয়া
তোমারই আঙ্গুলে মায়া ছিল, রোদ বক্র ক্রমপরিমান, বলেছিলে
লম্বা সফর শেষে
যতদিন কথা না দেওয়া
ততোটুকু মাস বর্ষ আগ্রহ সমাপন না জেনে, আমাদের কথকতা
হবে, যদি তার সন্মতি থাকে,
যদি তার রিক্ত থাকে অলিন্দ নিলয়
এখনো বন্দর থেকে চুপিচুপি চলে আসে বাহু বোতামের ভাঙ্গা
ঘর
চিঠিরা উচ্চারিত। আরো শব্দঘোর হলে দেখা
অসম্পূর্ণ তারাদের গতি নুয়ে যাবে অবগাহনের আগে।।
ফ্ল্যাশ ব্যাক
বাতাসের এপার ওপার
অরূপের আশ্চর্য দুয়ার.
মাটির সোঁদা গন্ধে কবিতা ভালই আছে,
অন্ধ ছুটির দিন
বন্ধ দরজায় ---
কড়া নাড়বে না আর কোনদিন কেউ ।
শিশির ভেজা ছন্দে কবি তো ভালই আছে,
কিভাবে এসেছে এপথে
কেনই বা বিশ্রাম এতো ---
ইটের ফলক তুলে খুঁজবে না কেউ ।
দাঁড়াও পথিকবর --- মাইকেল স্বর ভাসে,
তিষ্ঠ ক্ষণকাল
দারিদ্রেও কবিতা বাঁচে ---
এতক্ষণে বিষাদের সুর সাধে কেউ ।
কুঞ্জবিহারী নামে পাখিদের কূজন মিশে রয়েছিলো বলে
কতবার ডাকি কুঞ্জবিহারী ততবার অতীত কেঁদে ওঠে
যে শব্দগুলো চাইনি কোনদিন
তার নিঃশব্দ আত্মারা
কেন যে সশব্দে অট্টহাসে...।
যে দৃশ্যগুলো ভুলে যেতে চাই
তারাই স্বপ্ন গভীরে
কেন যে সদৃশ তাণ্ডব নাচে...।
যে অনুভুতিদের ফেলেছি ডাস্টবিনে
তাদের অসহ্য দুর্গন্ধ
কেন যে পচিয়ে দেয় মেধা...।
যে জীবন চাইনি কোনদিন
তাদের বায়স্কোপে
যেন দেখা যায় ফ্ল্যাশব্যাক...।।
ট্রাজেডি
মজ্জাহীন জীবন থেকে খুলে নিতে পারি না জড়তা,
ক্ষমাহীন অক্ষমতার বিবর্ণস্তুপে
দিতে পারি না আগুন।
পাতালের সঙ্গীত চৌচির করে আমায়
টুকরো টুকরো কল্পনায় খন্ড জীবন।
ঢেকে যায় স্থবিরতার পচা গালা বোধ
নড়াতে পারি না ভিত আর্থ কবির বর্ণমেলা।
খরস্রোত তার মধ্যে এই সমস্ত দুরন্ত পৃথিবীর
চিহ্ন মুছে যায় শুধু এই বিশাল নদীর পাজরে।
তোমার জন্ম তরুর মূল আর শাখা
আমার রাস্তায় অনেক কাঁটা, অনেক আঁকা -বাঁকা।
অকাল কঙ্কাল ছায়াময় স্বপ্নময় কলকাতা
দায়িত্বহীন স্বেচ্ছাচারী অজ্ঞান বৈশাখী
উম্মাদ নৃত্যের তালে তালে
কাঁপি দেওয়ালে বারান্দায় পর্দায়।
নিস্তরঙ্গ হ্রদের ওপারে দাঁড়ানো
একাকী বাতিঘর ঝাপসা।
বিহ্বল কিছু সুখ অসহ্য রূঢ়তার মতো
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় আমার -
আজম্ম ভিক্ষাপাত্র।
জলের শূন্যতায় ভেসে যায়
জীবন বিমার ডাইরি।।
অবৈধ কিনা
পায়ে পায়ে ফিরে যাই অন্ধ কোটরে
কাপুরুষ --- তা কি করে হয়,
ভালবাসা --- ভরা ছিল মগজ জঠরে
তবু আত্মা কেন বলে --- যাসনে ।
অনর্গল বৃষ্টিতে চলে ভিজে অক্সিজেন
কাপুরুষ ---চাবুক চালাতে চায়,
ভালবাসা --- কণ্ঠনালীতে দেয় ধ্বনি
তবু প্রেম কেন বলে কাছে আয় ।
মেঘের বাস আকাশের চড়াভূমি
বারে বারে তোমার অশ্রু সিক্ততায় ভিজি
রোজনামচা তোমায় বোঝাই,
দেখা অদেখায় তোমার অবাধ্যতায়
বারে বারে নিজের পরজন্ম খুঁজি ।
বারে বারে বৃষ্টি ধারার আড়াল বেয়ে
তুমি এসো অসময়ে সূর্যকিরণ সয়ে,
তোমার বহমানা ঘামে খেটে খাওয়া মানুষের
নিভৃত অবাধ্যতায় ---
বারে বারে নির্লোভ স্বতঃমৃত্যু খুঁজি ।।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন