ছুঁচসুতো
সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই
যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম
আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস
আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো
অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে
সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক
ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি,
ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই
গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ
বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল
টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান
এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি
কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে
সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই
রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!
নাটুয়া
গভীর ইঁদারাটির কাছে যাই, উঁকি মারি
ভেতরমহলে কার, নাটুয়া শরীর!
প্রতিবিম্বে শুয়ে আছি অনন্ত তরল
জাগতিক ভ্রম মেখে অসম্ভব স্থির
শঙ্খলগ্ন নিয়ে কত যে বলার ছিল কথা
তিলের বিলাপ নিয়ে জটিল বিভ্রম
হৃদিপদ্মটিতে এতদিন কাঙালপণায়
ছিল যে রেণুবিলাস, তার কথা বলতে পেরেছি কই!
ঝরে ঝরে পড়ে গেছে অসমাপ্ত শ্রম
মধুলোভি মৌমাছিদের চক্রাবর্ত পথে
নিস্ফল খুঁজেছি কিছু জান্নাতের ঘোর
সিঁঁধ কেটে নিয়ে গেছে মহাকাল চোর
অন্নদামঙ্গল আজও হয়নি তো পড়া
মোহিনীরূপের ভেতরে যে
কুচযুগ মেধাবী বর্ণনা, এখনও অধরা
কুয়োর অতল তলে পড়ে আছে নাটুয়া শরীর
পরনে পোশাক এক জাদুকর মায়া, জাদুর ধরম
শত শত চুমকি
বসানো
ভীষণ ধাঁধিয়ে দিই দর্শকের দৃষ্টির বিভ্রম
মেছুনী
মেছুনির নিজেরই শরীর যেন বঁটি হয়ে থাকে
ইস্পাত কঠিন তার ভীষণ ধারালো
ফালাফালা কেটে যায় খদ্দেরের চোখ
পিছল শরীর তবু চরম নাব্যতা ধরে
কার্ভেচার আর ক্লিভেজের ঘরে
থরে থরে সাজানো বন্দিস
মেছুনির সোমত্ত শরীরে রেণু হয়ে লেগে থাকে
খদ্দেরের ভ্রম
ভ্রমের ভেতরে পরকীয়, অনন্ত পিপাসা
মাছের আঁশটে গন্ধ ঘেটে দেয়
ঘোরের বিভ্রম
বঁটির উপরে ফালা হয়, আসঙ্গ লিপ্সার থেকে
লাফ দিয়ে নেমে আসতে চাওয়া বাঘ
উদাসীন মেছুনি এসবই জানে
মাছের আঁশের নিচে ঘন হয়ে জমে থাকে
পদ্মগোখরোর থুতু
ছিটকে গেলে অন্ধ হবে কামুক বায়স
মরা মাছ খণ্ড খণ্ড কেটে দিতে দিতে
ভ্রূক্ষেপবিহীন সেই আগুনে মেছুনী
শরীরী বঁটিতে আরো কৌশল ঢুকিয়ে
নেড়ে দেয় খদ্দেরের পৌরুষের থলি
মরা মাছ নিয়ে থলি হাতে বাড়ি যায় সম্মোহন
এমন জলের কাছে
এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল
তারও তো আছে এক চিত্রল হরিণ,
নিভন্ত কপাট খুলে যখন বেরিয়ে আসে
জায়নামাজ তুলে রেখে কবিতা পড়তে বসে গালিব…
এমন জলের কাছে আশ্চর্য ফুটুনি নিয়ে
কখনও যেওনা পরাশর
তাহলে কোনদিনও পাবেই না তোমার মৎস্যগন্ধাকে…
দেখবে তখন, সিন্ধুঘোটকেরা প্রকৃত দর্শন ভুলে
এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে
সমুদ্রতটে ঘুমিয়ে থাকা ঝিনুকের বুক।
এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল,
দেখ তার থরথর ঠোঁট, ঠোঁটের অলিন্দ বেয়ে
গড়িয়ে গড়িয়ে নামা রাধিকা অসুখ...
যজ্ঞভূমি
বেড়া বাধার কালে ওপাশে বন্ধন দড়িটি
শক্ত করে ধরে রাখে যে, সেই তো আমার মা!
তবু তার গর্ভজলের গন্ধ পেয়েও বুঝতে পারিনা
ব্রহ্মাণ্ড থেকে উঠে আসা জগৎ সর্পভ্রমে রজ্জু নয়
আর এই জগতের নাভিমধ্যে যে কুয়ো, সেখানে
ডুব দেওয়া সহজ কথা নয়, যে পারে সেই পারে,
তখন তার শরীর হয়ে ওঠে সেই কাঠবেড়ালির,
উন্মাদ হয়ে যে খুঁজে ফেরে প্রকৃত যজ্ঞভূমির...
অতলান্ত সাগরের ঢেউগুচ্ছে আলো জ্বেলে বসে আছে
যে রমনী, তাকে একবার মা বলে ডেকে দেখ,
ব্রহ্মের নাভি থেকে বেরিয়ে আসা শক্তির দোলা খেতেই
ডিঙি নৌকা হয়ে উড়ে যাবে অসীমের দিকে...
সেখানে তো কোনও পাহাড় নেই কেবল অতলের মুখ…
মৃত্যুর ভেতর থেকে বের হয়ে
কতকাল ধরে লেগে থাকা অপমান মুছে
তপস্যায় যাবে সেই প্রাচীন শম্বুক...
মধুযামিনী
এমন যে রূপকল্প তার কাছে থিতু হয়ে বসি।
দেখি, সে রূপের মঞ্জরি সকল,
অক্ষর প্রতিমা হয়ে ওরা সব ভ্রমর-ভ্রমরী,
মিথুনমূরতি মাখা রাধা মাধবের ঘাটে জলকেলি করে...
বিদ্যুৎ তরঙ্গ এসে এঁকে দেয় আলিঙ্গন কুসুম অগ্নিতে...
নৌকাবিলাসের দিকে এখন যাব না কিছুতেই,
উবু হয়ে বসে দেখে যাব রতিকল্প রূপ,
বৈষ্ণবের রসকলি সাজের ভেতরে
দেখব কেমন কুঞ্জবন আঁকা,
রাধাকৃষ্ণ লীলা খেলে রাসের বিস্ময়,
ললিতা বিশাখা আর চন্দ্রাবলী ঘোর...
এমন রূপের কাছে বসে,
যেন গেয়ে যেতে পারি গোবিন্দের গীত,
রাইয়ের নূপুর থেকে তুলে নিতে পারি
পয়মন্ত পরকীয়া ঘোর...
যেন বলতে পারি,
এই যে স্মরণে আছি সেই কি যথেষ্ট নয়?
মধুযামিনীতে ব্রহ্মকমল ফুটুক হিরন্ময়…
পরাগ দোতারা
পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসি, ছায়া পড়ে জলে
আনন্দ-সাঁতার ধরে মাছেরা অবাক হয়ে দেখে,
জাগতিক ভ্রম মেখে কাছে আসা আশ্চর্য মানুষ!
জলের উপরে উঠে পাখনা নেড়ে ইশারা দেয় কত,
যেন বলে, পড়েছ কি চন্ডীদাস, পদাবলী কথা?
রাধিকার বিনোদিয়া বিভঙ্গের ঝরে পড়া আলো
দেখেছ কেমন খুঁজে নেয় পরকীয়া বাঁশিটির
ছিদ্রপথ আলোকসম্ভব? আনপথে নূপুরের ধ্বনি
মিলনের কাঙালপনায় জেগে ওঠা কীর্তনবাসর,
অথবা দেখেছ কোন চর্যার হরিণ,
অঙ্গ বেয়ে ঝরে পড়া নীলাভপ্রণয়?
বলি না কিছুই শুধু মাছেদের দেখি, আনন্দ-হ্লাদিনী…
তারা কেউ একাকিত্বে ভোগে না কখনও,
বেঁধে বেঁধে থাকে আর এ-ওর গায়ের থেকে
খুঁটে খুঁটে তুলে দেয় জমে থাকা শ্যাওলা প্রয়াস…
পুকুরের জল থেকে ছায়াটি তুলতে গিয়ে দেখি,
রতিমুগ্ধ বসে আছে সিদ্ধাসনে, কবেকার
রামী-চন্ডীদাস!
পতন
জল পতনেরও একটা মাধুর্য আছে
যখন তা নেমে আসে বৃষ্টি ফোঁটা হয়ে...
এসময় কিশোরী মেয়েরা এই ভার্চুয়াল সময়েও
গোপন কুলঙ্গী থেকে বের করে তাদের নূপুর
রাই না হলেও চন্দ্রাবলী ঘোর হয়ে
নৃত্য করে অনাবিল পিছল উঠোনে...
তাদের মায়েরা পুজো ঘর থেকে উঠে এসে দেখে
মেয়েদের নাচের মুদ্রায় কত বৃন্দাবন গাঁথা হয়ে আছে...
অথবা ঝরনা পতনের কথা ভাবো,
মানুষের দৃষ্টি কুড়োবে বলেই অবিরাম নগ্ন থেকে নগ্নতর...
এই পতন পবিত্র বড়, প্রকৃতিগ্রন্থিত
এমন পতনের কাছে ঈশ্বরও পেতে দেয় তার হাত
যেন এক সম্মোহিত অনন্ত কাঙ্গাল...
স্নানঘরে জলের পতন নিয়ে কত কবি লিখেছে কবিতা...
মেঝেময় পড়ে থাকা মেয়ের স্নানের জল থেকে
স্নেহটুকু গোপনে কুড়িয়ে রাখে সুজাতার পিতা…
নাচের ইস্কুল থেকে
নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসে যে আলোস্রোত
তার নাম ধরে নাও ঘুঙুরবিলাস...
মোহনিয়া রূপ, দেবদারু বন দিয়ে যখন ভ্রমণ
দেবদাসীরাও উছলিয়া উতলিয়া
কুড়োতে থাকে তার প্রসব করা শস্যদানা,
ক্যাকটাসের শরীরে বেজে ওঠে পাতাল তরল...
কে এঁকেছ ব্ল্যাকবোর্ডে দাঁত দেখানো ষাঁড়?
শোনোনি অলকানন্দা অথবা গহরজান?
অনুরাগ যেদিন চুইংগাম হয়ে আঁকড়ে ধরবে দিল
আরশিনগর খুব তোলপাড়,
তখন বুঝবে ধনী, বনজ্যোৎস্নার
আকর্ষের প্রয়োজন তো পড়েনা কোনোদিন...
কে এঁকেছ নকশি কাঁথায় হরিণের মাংস উত্তাপ?
নদী যখন বয়ে যাবে নৌকা সোহাগে, তার ঢেউগুলি দেখ,
তারা সব নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসা
এক-একটি পাখি,
যাদের কোনও উপমা নেই
শুধু লিরিক্যাল মুদ্রা আর কত্থকের স্রোত...
পাথরের কাছে
পাথরের কাছে যাই
দেখি, প্রাণ আছে, পাখির কোমল ধ্বনি
শোনা যায় পাতা হলে কান...
রজস্বলা সমুদ্রের ঢেউগুলি গোপন নির্জন
অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে, যেন
নিজস্ব শিহর পেলে জেগে উঠবে এখনই
সান্দ্র আবেগের থেকে নেচে নেচে নেমে আসে
শ্যামের বাঁশিটি আর রাধিকা নূপুর...
দেখি, এক পথও আছে কুঞ্জের ঘরানা...
পাথরও বলেছে কথা, ভেতরমহলে এসো
উট আছে মরুভূমি, কাঁটাগুলি উদ্গাত প্রাণা...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন