দশটি কবিতা : ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়

 দশটি কবিতা : ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়

 

রাগদেশ
 
আকাশের মতো নীলে নদী বেঁধে দেখিনি কখনও
প্রচণ্ড জলের তোড়ে কীভাবে ভাসন্ত ধুলোঝড়
বুঝিনি, কেন যে এত কথালীন কাছাকাছি এলে
থেমে যায় অসম্ভব বিকেলের গল্প পরস্পর
 
বিকেলের কথাবার্তা আলো ও ছায়ার পাশে হাঁটে
নদীতীর বসে নেয়, অবিশ্রাম জললতাঘ্রাণ
সন্ধে হয়, ছায়া থেকে আলো-তাপ ছেঁকে নিয়ে মনে
ঘরে ফেরে, সারারাত ধরে চলে উজ্জ্বলতা-স্নান
 
স্নানের পরেই জানি পাওয়া যায় অনিবার্য মন
হৃদয়ে হৃদয় মিশে মন্থনের নীলঅকারণ
কারণের শেষে বসি, থেমে যাই, চলাটিও শেষ
শেষের শেষেই ওড়ে চলনের বিরহ-নির্জন
 
নির্জনও বিরহময় বড় বেশি একাকিত্ব-জ্বর
উত্তাপের ঢল বেয়ে ধেয়ে আসে মগ্নতা আভূমি
বোধেরও অতীত বোধে ডুবে যাই আশিরনখর
চেতনার জটে তবু জেগে থাক অচেতন-ধুন
 
প্রতিটা গল্পেই কিছু মোড় ও মুহূর্ত আনাগোনা
অবশেষ রেখে যায় রাগদেশে বৃষ্টি ও রোদ্দুর
অনুরাগ আসে তার পিছু-পিছু অনুভূতিরঙা
দুজনের মধ্যে রাখে একটিমাত্র রঙের ঘুঙুর
 
ঘুঙুরেও রং বাজে, বেজে যায় দুজনের ফাঁকে
দুজনের পথ তাই ক্রমাগত দুটি দিকে বাঁকে... 
 
  
তারের মোচড়ে ওড়ে ভাঁজ
  
একটা রোদ-ঝকঝকে সবুজ ওড়না মেলে ছেয়ে আছে পথে
আমিগুটিসুটি বসি রোদের ভেতরে, 
কী যে হলুদরঙের গাছ! ডালে ডালে রঙিন পাখির   
লাল ঠোঁট, গুঁড়িগুঁড়ি চেরিফল
আমিও তো উবু হয়ে সবুজ রঙের কুর্তির গা-থেকে তুলি নুড়ি,
লালরঙা মাটির কিছু স্মৃতি, গভীর এঁটেল 
হাতে-মুখে লেপটে থাকে শুকনো আঠার সাদাটে দাগ   
রোজ একা হলে সেই দাগে বাজে     
মিলন-পারের দীর্ঘশ্বাস
 
মনের ভেতরে থাকা ঝড় খায় পাক 
ভায়োলিনে এসে বসেন নিকোলো প্যাগানিনি
তারের মোচড়ে ভাঁজ খুলে ওড়ে কত সবুজ রঙের জামা 
কানের দুলের মুক্তো খসে গেলে ফোঁকরের ধুলো থেকে উঠে আসে
সেইসব বিচ্ছেদের ফাঁকা মাঠ
আলের উপর অগোছালো বট
পাতার ঝাঁপিটি এসে গায় বন্ধন-মুক্তির গান   
কবেকার বাক্সে থাকা সোঁদাগন্ধী উড়ন্ত জামারা
তখন দিগন্তে, নীল নয়
মাথার ওপর উড়তে থাকা সবুজ-রঙিন এক নিজস্ব আকাশ...
 
 
আগুনবটের চারা
 
সুর ভুলে যাওয়া বাউলের একতারা
অগোছালো এক দিনের আড়ালে হাঁটে
হারানো সুরের ব্যথা লেগে জ্বলে তারা
পাওয়া না-পাওয়ার পথ থেমে আছে মাঠে
 
সে-সব দহনে ধিকি-ধিকি বেঁচে থাকা
গুছিয়ে রেখেছে চেনা করোটির মালা
মানে-অপমানে মৃতআগ্নেয়বোধে
চাপা পড়ে গেছে বাউলের আটচালা
 
ভাবনা তবুও চলেছে দূরের পথে
হেঁটে হেঁটে খোঁজে নিভৃতির কোনও দেশ
জ্বলন্ত সেই একাকীর সন্ধানে
বন্ধুর হাত হয়েছে কি নিঃশেষ ?
 
দেহ-মন জুড়ে আগুন-বটের চারা
জড়িয়ে উঠেছে ক্রমশ মাথায় শিখা
জ্বালানি ফুরোলে নিজেরই পাই না সাড়া
মৃতদেহ জুড়ে দাহটির জয়টিকা
 
উত্তাপে পোড়া ছন্দটি ক’রে আলো
করোটি-জীবন খোঁজে কবিতায় প্রাণ
আমরা এখনও সুরভোলা গৃহপাখি
প্রতি বন্ধনে গাই বাউলানি-গান... 
 
 
 
চড়াই
 
ভাসানে প্রতিমা গেলে খড়টুকু ভেসে থাকে জলে
ভাসন্ত খড়ের পাশে ফোটে শালুকের ফুল
গোল গোল পাতা জুড়ে
জলপিপির অনিবার্য হাঁটা-চলা
আশ্চর্য গোলাপি আভা
সরোবর ছেড়ে ওড়ে
             স্মৃতি গুঁড়ো গুঁড়ো
ঊর্ধ্বমুখী আলোর মায়ায় ঘেরা ঘোর
জীবনের গায়ে পড়া ঢাকের কাঠিরা
 
দু’চারটে পাপড়ি তুলে পরে নিই চুলে
পদ্মবীজ-কথামালা গলায়, বাহুতে
শ্রীমৎস্যকন্যার মতো মনে হয়
লীলায়িত সংসারের খুঁট খুলে
সর্বাঙ্গে জড়াই
 
এতটা আনন্দ এলে দুঃখ শুধু কুটোখড়
                আর কিছু
              উড়ন্ত চড়াই...
 
 
একটা সিঁড়ি ও আশ্চর্য বালতি 
 
মনের ভেতর একটা সিঁড়ি
ধাপে ধাপে সুখ-দুঃখ-কান্না
আশ্ঢর্য বালতি করে ওঠে আর নামে
ব্যথার রাতের শেষে সূর্য উঠলে 
কোনও দিন রাত ছিল মনেই হয় না
 
ফেলে আসা মহুয়ার ফল
মুচকুন্দ গাছের সারি, সুরকি ফেলা লাল পথ
তোমাদের আসা
যত না থাকার গান
শূন্যতারা বাজে আরও বেশি
শুধুমাত্র ছুটোছুটি এ-তীর ও-তীর,
স্পর্শ ওড়ে, ধরা তো যায় না
 
গন্ধটুকু ধরে নিয়ে রুমালের কোণে
আঁকি সামান্য গোলাপ
বাগান-বিলাস থেকে পাপড়ি তুলে দিই গেঁথে
সুচের ফোঁড়ের সঙ্গে গোটা পথ অপেক্ষার
 
নদীতীরে অবিশ্রান্ত স্নান সেরে ঘরে যাই আমরা
পাখিরাও ফেরে আর ফেরে দলে দলে
লাল-নীল ডানাদের পালকেরা ভাসে
 
সিঁড়িটির ধাপ ঘোরে
প্রচণ্ড ঘর্ষণে তাপ মেঘ হয়
প্রতিবার শ্রাবণ-বিকেলে বৃষ্টি হলে
ধুলো ধুলো স্মৃতি ঝরে 
 
সবুজ কাচের চুড়ি, ওড়না-বাঁধনে টিপ, কাজললতা
তোর সঙ্গে কাটানো বিকেল, দামোদর নদ
মেঘবৃষ্টির তোড়ে কিছুই আলাদা করে চেনা তো যায় না...  
 
 
 মা-টি
 
গর্ভের মধ্যেও থাকে এক নৌকো
মাস্তুলে ঝুলন্ত চাঁদ, চাঁদের ঝরনায়
জল থাকে, ঝরে যায় নির্দিষ্ট ধারায়
বীজ এলে আবর্তন বাড়ে, চাকার শিরায়
 
ক্রমে বেড়ে ওঠে ঘাস নরমসবুজ
মা বোঝে প্রথম শ্বাস, নড়াচড়া-স্পর্শ
শরীরে বীজের দুধ উথ্‌লে ঝরনা-জলে  
পাশ ফিরে সাড়া দেয়, নৌকার শাবক
 
এত কিছু জেনে গেলে মেয়ে মা-টি হয়
হাতে মুখে মেখে নেয় ধুলোর সময়...
  
 

শঙ্খচিলের মা 
 
মনের ভেতর একটা ঝিল
সবুজ জলের মধ্যে কচুরিপানার ফুল
আহা!
বেগুনি রঙের আভা আজও
ঝিলের দু’পাড় ঘেঁষে ঝুমকো জবা
সারি সারি নারকেল গাছ
ভোরবেলা হলে দিদা হেঁটে যান সাজি হাতে
 
নারকেল গাছের মাথা পাক খায় চক্রাকারে
ঝড় এসে ডানা মেলে বসে পড়ে বাসার ওপরে
চামচিকে ও দুটো সাপ দেখে সেই সব
ডিমে তা দিয়েই যায় শঙ্খচিলের মা
 
দিদা এত কিছু না বুঝেই ঢুকে যান ঘরে
 
মাথার ওপরে চক্রাকারে মার
আর সুখ মুখোমুখি
জিততেই হবে
পিঠের দাগের কাছে নত হলে মৃত্যু...
 
খুব বেশি দূরে নয় সমুদ্রের ঘ্রাণ
অনন্য নদীর পার, কয়েকটি অখণ্ড মাঠ 
পেরোলেই নোনা ছাট মুখে এসে লাগে
ভেতরে উড়ন্ত কিছু বিরহ-বিশ্বাস
আমার কন্ঠেও লাগে বিন্দু বিন্দু ঘাম
 
কথা বলি,
নিজেই নিজের কাছে একা
সমুদ্র-শঙ্খেরা বাজে শিরা-ধমনীতে
প্রাকৃতিক প্রেমে জমে দিন-রাত, রাতের পাথর
জল ঝরে,
রক্তের সামান্য বিপরীতে
 
ঝরে যাওয়া জীবনের রীতি
বালি ঝরে, লেগে থাকে নোনা শ্বাস
সমুদ্রও ঝাউপথে হেঁটে যায়
আমরাও
মা-বাবার হাত থেকে প্রেমের হাতের ছায়া ধরে
          সন্তানের বাহুতে জিরোই...
 
জীবন চলার পথ সোজা যায় সুগন্ধি টিলায়
বলাটি সহজ কিন্তু পথ কিছু বাঁকা
কাঁটা আছে, ইতস্তত মারের চাবুক
পলাশ-চোখের দুঃখ আঁকা সেখানেও
 
গাছপালা সোজা সোজা, তেমন জঙ্গল সে তো নয়
মাঠের সবুজ ঘাস পুড়ে খড়
মাঝে ক’টি খেজুরের ঝাড়
দূর থেকে মাথা নাড়ে
মনে হয় হাত ঝেড়ে উঠে পড়ি
সন্ধ্যা টেনে বসাই সম্মুখে
প্রচণ্ড নীলের মধ্যে দুঃখ ডুবে যাক
সহজ তো নয় সেই সুখের সন্ধান
নিজস্ব মাপের গোলাকার
পুরনো-নতুন ওড়ে, খায় পাক
বসে পড়ে
পাশের জমিতে চক্রবৎ অনাবিল
 
নারকেল গাছের মাথা ঝড়ে নুয়ে পড়ে
বাসাকে সূর্যের মতো ভেবে নিয়ে আজীবন ঘোরে শঙ্খচিল...    


 
পৃথিবীর ঢাল বেয়ে চলা, আজন্ম অভ্যাস মনোমতো হওয়া সময়ের
কার যে কথায়, কার জন্য, অন্যের সমুদ্র থেকে ঢেউ-শব্দ-গন্ধ
তুলে জলজ প্রাণীর মতো বাঁচা, মাথা নিচু,
যদি হতে পারো পুতুল বা মৎস্যকন্যা, নীল চোখ, সামান্য মনের
 
পুতুল-সংসারে থাকতে থাকতে সন্তানবতী হলে বাজে গান  
উৎসবের গ্লাসে উথলে ওঠে সুধা, বীজের শিশু থেকে গাছ
তাদের শিকড় ধরে হাঁটতে বেরোন বসুধা
 
হোক গর্ভপাত, হোক না ধর্ষণ, চিৎকার নয়, চুপ
চিৎকার নয়, লক্ষ্মীমেয়ে, দেওয়ালেরও কান আছে,
সুতরাং আরও ধীরে, আরো মৃদু সুর
মরে গেলে ক্ষতি নেই, কেন্নোদের বংশবৃদ্ধি প্রচুর
 
কথা নেই, কান বন্ধ, কানের মধ্যে মাছির ভনভন
শুধুমাত্র অভ্যাসবশে কাপড়ের আঁচল জড়িয়ে রান্না থেকে স্কুল
মাথাভর্তি বৃষ্টি-বাদলা নিয়ে বারংবার দৃষ্টিহীন ফিরে আসা  
হাত ভোঁতা, পা-দুটি লতপত করে জলে 
অফিস ফেরত রং ধাক্কা দিয়ে সেই কবে গেছে চলে
 
আর নয়, পারা যাচ্ছে না এইভাবে, চাকায় সুতোর মতো জড়িয়ে জড়িয়ে বাঁচা
আটপৌরে সুতির শাড়ি মাঝে মাঝে ছেঁড়া, ইঁদুরেরা গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে পৌঁছে গেছে বনে,
মানুষেরা নেই। কয়েকটি টিলার পরে হয়তো কিছু ফাঁকা, আলোকণা
তারপরেও হাঁটতে থাকলে পাওয়া যেতে পারে আশ্চর্য বাগান, কল্পবৃক্ষ, ঝরনা…      
 
 
 
 
 
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন