রাজীব ঘাঁটীর কবিতা

রাজীব ঘাঁটীর কবিতা



যাপন পদাবলি

 

১.

ছাইপাশ ভাবছিলাম, ভালো ভাবতে ভয় পাই

অথচ কত সুন্দর হতে পারতো এ যাত্রাপথ

ছুটতে ছুটতে পেরিয়ে যেতাম মাঠ ঘাট চেনা পথ

একদিন এভাবেই অন্ধকার নেমে আসে পথে

 

জীবনের রঙ আঁকা হয় না কোনো ক্যানভাসে

অপেক্ষমাণ সময় প্রতিদিন নতুন গল্প সাজায়

বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বদলে যায় যাপন।

লিখে রাখি শুধু পূর্বপুরুষের অহংকার।

 

এ জীবন পরিসংখ্যানে গরমিল সব হিসাব

শুধু নিজেরটুকু বুঝে নিয়েই জীবনপাত।

 

২.

সবাই যেমন স্বপ্ন সাজায়, আমিও সাজিয়েছি

তারপর ভাটা পড়েছে কত সময় আবর্তে

সময়ের কাছে বন্দক রেখেছি বিশ্বাস

পরিচিত বর্ণমালার ডাক পেড়েছে প্রিয়জনেরা

 

অযাচিত জ্ঞান দিয়ে গেছে পরিচিত অনেকেই

প্রয়োজনে ডাকলে যারা আসেনি কোনদিন

যাপন বিন্যাসে কৃষকের কথা নেই কোথাও

অথচ খাদ্য ছাড়া সবটাই বৃথা জানি।

 

স্বল্প সুখের খোঁজে চোখে লোনা জল সহজেই

অথচ সমুদ্রের জলে জীবন মেলাতে পারি না।

 

৩.

অক্ষর সহবাসের পর দেহের গ্রন্থ জন্ম হয়

তারপর খুঁজে ফিরি অসহায় মানুষের কষ্ট

একদিন বিপদে বুক পেতে দিয়েছিল প্রতিবেশী

নাগরিক -স্বজন, এখন সৌজন্যহীন জীবন।

 

 আগুনের গল্পেরা পোড়ায় না, দগ্ধ হতে শেখায়

যন্ত্রণার নির্যাস থেকে বেরিয়ে আসে এক

অন্য যাপনের গল্প। অপেক্ষায় আছে

কোন সুবিধাবাদী সবসময়, যাপন সতর্ক হোক।

 

সব ছবি অ্যালবামের হয় না

কোন কোন ছবি হৃদয়ে গেঁথে রাখতে হয়।

 

 

৪.

এখন আর ঠিকানার দরকার হয় না।

মোবাইল নম্বরেই কাজ চলে যায়।

আজকাল বাড়িতে আসার প্রয়োজন মনে

করে না অতি প্রিয়জনেরাও। অনলাইন

স্ট্যাটাস আপডেট থাকলেই হল। এভাবেই

বেঁচে থাকতে হয়, ভালো থাকা যায় না।

 

যাপন পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে আমাদের

ভাবসম্প্রসারণের জীবন ক্রমশঃ ভাবার্থে

আটকে যাচ্ছে। এ সময় বড়োই জ্বালাময়

এ সময় আশঙ্কার! এ যাপন বড়োই যান্ত্রিক।

 

 

৫.

হাসি কান্নায় সেজে ওঠা জীবনগুলো

এখন শুধুমাত্র লাভ - ক্ষতির হিসাব করে

আমরা ক্রমে ক্রমে ‘আমি’ তে রূপান্তরিত!

সবাই এক টুকরো স্বর্গ গড়তে চাইছি

 

ব্যপ্তি কমছে ছোট হচ্ছে আকাশ

হয়তো সব হারিয়ে যাবে, আবার নাও পারে

একদিন হয়তো নতুন করে কেউ লিখবে

নতুন কোন যাপনের বসবাসনামা।

 

সূর্য বেলায় সেই আলো আর উত্তাপে

আমরা নতুন দিনের গল্প লিখবো।

 

৬.

বেঁচে থাকাটাই যাপন কথা নয়,

যাপনের অনেক গল্প আনকোরা

সময়ের সুখ খুঁজে ফিরি রোজ

একদিন নতুন যাপনের গল্প লিখবো।

 

সুখের কথা বলে যাও অকপটে

শুধু সুখ চেয়ে বোসো না কোনদিন

দুঃখ সাজাতে জানলেই কাটবে প্রহর

সুখী জীবনের কোন উপাখ্যান লেখা হয়নি

 

৭.

সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতি বদলায়নি গাছ,

তার ধর্ম নিয়েই সৃষ্টির সময় থেকে আজও

কথায় আছে “বোবার শত্রু নেই”

অথচ গাছের এত শত্রু কেন?

 

হাজার বছরের অপেক্ষা থাকলেও গাছ

বদলায়নি তার যাপন পদ্ধতি কিংবা বোবা থাকা

আমরা রোজ বদলাই, বদলাতে চাইও

অথচ নিজেদের শোধরাতে ভুল করি শুধু।

 

এ জীবন অক্সিজেনের হিসাব করে, অথচ

গাছের হিসাব রাখে না কোন বুদ্ধিমান!

যাপন বদলানোর চেয়ে নিজের বদল জরুরি

অথচ দোষারোপের জীবনযাত্রা আমাদের!

 

৮.

জীবনের সব পরিসংখ্যান হুবহু মেলে না

তুমি শুধু নিজ অঙ্কের হিসাব বুঝে নাও

এখানে লাভের অঙ্ক যেন ঠিক থাকে,

তা নাহলে প্রতিদিন ব্যর্থ জীবনের দিনলিপি লিখবে।

 

যোগ করতে শিখলে বিয়োগের গুরুত্ব বুঝবে,

খামখেয়ালি হয়ে লাভ নেই। গিভ অ্যান্ড টেক

না হলে কেউ খবর রাখে না আজকাল

আমিত্বের স্থায়িত্ব ক্ষণকাল, নয় কি?

 

৯.

বাবর, আকবর কিংবা ১৭০০, ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দ

এসব ইতিহাসে থাক, নিউটনের সূত্র মেমরীতে

ধারণ করে বাস্তব জীবনে বাঁচতে হবে,

যাপন এটাই!

সব বিষয় জরুরি শুধু সিলেবাসে,

আসল ছবি অন্য!

 

হাততালি সবার জন্য থাকতেই পারে

শুধু বিশেষ পছন্দকে “সাবাশ” বলো।

 

১০.

বেঁচে থাকার অধিকার নেই, কারন আছে।

মৃত্যুর অজুহাত খুঁজতে হয় না আজকাল

মৃত্যু হঠাৎ আসে বজ্রপাতের মতো

তবুও আমাদের কত ভাবনা ভবিষ্যতের!

 

বর্তমান যেখানে ক্ষণস্থায়ী, অতীত সন্দেহে ভরা

সেখানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিলাসিতা মাত্র!

 

এ সময় যাপনের কথা বলে, বাঁচা শেখায় না

লড়াই শিখতে হয় না এখন, প্রতিযোগিতার

বীভৎস সময়ে। পিছনে তাকালেই পিছিয়ে

পড়ার ভয়! তাই দৌড় শুধু সামনের দিকে!




 

শক্তিপদ পাঠক-এর কবিতা

শক্তিপদ পাঠক-এর কবিতা

 


শীতঘুমে আছি

 

সারারাত ঘাসের উপর শিশিরের কণা জমে।

এই অনন্ত শীতরাত্রি, ঘনীভূত চাঁদ,

বুকে তার দূরগামী পাতাঝরা বন।

হলুদ পাতার নীচে জমে থাকা শীতঘুম

আমাকে নিবিড় করে কাছে ডাকে।

মাঠের গর্তের মধ্যে মেঠো ইঁদুরের

          চুরি করা ফসলের ভাগ

যে সব ছেলেরা নেয়, তাদের বারণ করো।

আহা! সব জীব বেঁচেবর্তে থাক।

আমরা সবাই তো একদিন

শিমুলপাতার মতো ঝরে যাবো শীতের বাতাসে।

তাই যত পারো ওম দাও,

মাঠে মাঠে ভালোবাসা দুহাতে ছড়াও।

শীতঘুম থেকে যেন জেগে দেখি

আবার নতুন পাতা ভরে গেছে সব গাছে গাছে।



প্রেমময় 

 


ঐ পথ কাদায় পিছল,

ও পথে তোমার যাওয়া মানা।

পতনের ভয় মিশে আছে,

ও পথের চোখ নেই, কানা।

 

এই পথ সোজা গেছে ঘরে,

পিচঢালা, খানাডোবা নেই।

দুইপাশে নুয়ে পড়া গাছ,

সাদরে ডাকছে তোমাকেই।

 

চোখের পাতায় জমা ঘুম,

নাকের পাটায় তিলফুল,

আমাকে অবশ করে রাখে,

হয়ে যায় সব কাজে ভুল।

 

আমি তাই ভুল পথে যাই।

কাদাকে ঘাসের মাঠ ভেবে

শুয়ে আছি জমে থাকা জলে,

আমাকে কি ঘরে ডেকে নেবে?

 

ঘরের মেঝেতে লেপা ছায়া,

ছায়ার গভীরে লেখা নাম,

নামের অতলে আছে প্রেম,

প্রেমময় তোমাকে প্রণাম।



জীবন


 

জীবন কিছুই নয় - একটি প্রদীপ,

তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে রাখা শুধু।

হাওয়ার ঝাপট থেকে দুহাতে আড়াল করে রাখি।

পাছে যদি নিভে যায় এই ভেবে সচকিত থাকি।

মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে আগুনের শিখাকে কাঁপায়,

তুমুল মুষলধারে বৃষ্টি নেমে

          আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়।

সলতে ফুরিয়ে গেলে একদিন শেষ হবে জ্বলা,

আঁধার লুটাবে পায়ে, শেষ হবে সব কথাবলা।

ভয় হয়, এভাবেই মুছে যদি যাই,

তার আগে আমি যেন একবার

                  তোমাকে নিবিড় করে পাই।



আহত সৈনিক 


 

পিছনেই থাকি।

তোমরা এগিয়ে যাও অভ্ররেণু,

বিনত ডালের সঙ্গে দোল খাও।

অনেক দূরের পথ, পাহাড়িয়া গ্রাম।

উঁচু উঁচু টিলার ভিতরে

    মেষচারণের ফাঁকা মাঠ।

ঘাস আছে, টলটলে জল আছে।

ওখানে রাতের শেষে অনুপম ভোর,

ওখানে দিনের গায়ে মখমলি রোদ,

ওখানে নাচের পায়ে উতলা ঘুঙুর,

নিবেদিত কথাগুলি সেইখানে

    প্রাচীন গুহার কাছে রেখে এস।

আমি আর সামনে যাবনা।

আমার পায়ের পাতা

    বেঁকে গেছে স্থলিত বিষাদে,

ইচ্ছা সব মরে গেছে।

এরকম পরাঙ্মুখ মন নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?



আত্মশুদ্ধি 


 

বেলা হল,

এবার নদীর ঘাটে স্নানে যাও।

বুকজুড়ে চ‍্যাটালো পাথর,

যা কিছু অর্জন আছে কাচাকাচি করো,

জলে নেমে ঠান্ডা হও, ঢেউ মাখো।

তোমার পায়ের তলা পথের উত্তাপে পুড়ে

                                  কালো হয়ে গেছে,

ফোস্কাপড়া চামড়ার ভিতরে জমা দাহরস,

এখানে জলের মধ্যে তারও জেনো

                                  নিরাময় আছে।

স্নান সেরে ধীর পায়ে উঠানে দাঁড়াও,

চেয়ে দেখ, ধোঁয়া ওঠা ভাত

          এখনও তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে।



আকাঙ্ক্ষা


 

অপরাধগুলি মাটিতে নামিয়ে রাখি,

          পোড়াব যে, সে সাহস নেই।

এখন আমার দেহ পালকের মত

          আলগা বাতাসে ভাসে।

এসো ঝড়, আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাও।

পাথরের মত ভারি পাপগুলি

          যেন না পাঁজরে উঠে আসে।



পাতালছায়া 


 

ঘরের পাশেই ঘন বাঁশঝোপ,

          ঐখানে পেঁচাদের বাসা।

রাতের শিকার সেরে দিনের বেলায়

ঘুমঘুম চোখে নামে হিম ভালবাসা।

কুটুসের ফুলগুলি তারার মতন

ফুটে থাকে আঁকাবাঁকা পায়েচলা

                  পথের দুপাশে।

উইয়ের ঢিবির থেকে খরিসের ছানাপোনা

          ভুল করে ছায়াছায়া দিনের আলোয়

                  বাইরে বেরিয়ে চলে আসে।

ওইখানে বসে থাকি বাঁশের মাচায়,

          তখন তোমাকে মনে পড়ে।

আকুল শিকড় নামে পাথরের কোল ঘেঁষে

মাটির গভীরে, অটল দাঁড়িয়ে থাকে গাছ,

                  আমাকে উড়িয়ে নেয় ঝড়ে।

পাক খাই লাট খাই ধানক্ষেতে মাঠে,

ছেঁড়া সুতো, কার হাতে স্থবির লাটাই!

পেঁচার ঘোলাটে চোখে ঘুমঘুম ভালবাসা,

খরিসের বিষদাঁতে ফোঁটাফোঁটা ঝরে পড়া

    মুক্তোর দানার মত বিষ বুকে নিয়ে

          আবার তোমাকে পেতে চাই।



স্বপ্নে দেখা বাড়ি 


 

তোমাদের বাড়ি যাব বলে

সেই ভোররাতে বেরিয়েছি,

          পথ খুঁজে পাইনি এখনও।

দু কদম না যেতেই

গমক্ষেত শীষ নেড়ে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে,

গোপনে ভাংচি দেয় - এইভাবে যেওনা কখনও।

নদীর জলের নীচে রুপালি মাছেরা নাচে,

নাচ দেখি, ঢেউ দেখি, শস‍্যের সবুজে দেখি মায়া,

দুপুরে প্রখর রোদে বটপাকুড়ের গাছ

          মাথায় বিছিয়ে রাখে ছায়া।

বিকেলে নরম আলো

ভালবাসা ঢেলে দেয় পাখিদের গানে,

পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে খিদে পেটে বসে পড়ি

জীবন আমাকে ফের বাস্তবের দিকে টেনে আনে।

নিজের ঘরের কাছে ফিরে আসি ফের

          কেউ এসে ডাক দেয় - ‘শোনো।’

তোমার অদেখা বাড়ি বহুদূর

          যাব ভাবি - যেতে চাই,

                  যাওয়া তবু হয়না কখনও।



বিরহ 


 

রাস্তার দুধার জুড়ে রাধাচূড়া গাছে

তোমার গালের স্নিগ্ধ কোমলতা আছে।

আমি তাই বসে থাকি পথের উপরে

          যদি কোনো ফুল ঝরে পড়ে।

তোমার চুলের গন্ধ বয়ে আনে প্রেমিক বাতাস।

বেদনামথিত দীর্ঘশ্বাস

          ছুঁয়ে যায় আমাকে সহসা,

মনের গোপন ঘরে আলো জ্বলে, আলো নেভে,

          বিস্ময়ে হারিয়ে ফেলি ভাষা।

তুমি এক আলোর প্রতিমা।

তোমাকে খুঁজতে গিয়ে পার হই ম্লান দৃষ্টিসীমা।

তবুও হয়না কাছে পাওয়া,

তোমাকে উড়িয়ে নেয় ভিনদেশি দূরগামী হাওয়া।



আশা 


 

একদিন সবকিছু ফিরে পাব।

নিকানো উঠানভরা ধানের মরাই,

কাগজিলেবুর গাছে শালিকের বাসা

                                  আর খিড়কি পুকুর।

মাটি খুঁড়ে লুটে নেওয়া সোনার মোহর ফিরে পাব।

গোয়ালে আবার কালো নতমুখী গাভীটির

                   নতুন বাছুর হবে।

কেন্নো, কেঁচো, হেলেসাপ এখানে ওখানে ঘুরে

ফিরে এসে জীবনের কাহিনী শোনাবে।

ক'টাদিন কষ্ট করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাক।

বেড়া দাও চারপাশে, খড়িমাটি গিরিমাটি গুলে

          দেওয়ালে শিশুর মুখ আঁক।

এখন অশান্ত স্রোত শক্ত করে ধরে থাকো হাল,

রাত ঠিক কেটে যাবে, আলো নিয়ে আসবে সকাল।

সুবীর সরকার-এর কবিতা

সুবীর সরকার-এর কবিতা

 

পরিচিতি:

সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

 

 

সাজঘরের কবিতা


১.

নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দাঁতের ধার।

তাঁবুতে কুপির আলো, বইয়ের খোলা পাতা।

ড্রাগনের ছবিতে মাল্যদান শেষে শুরু হবে

                                       বিশেষ অধিবেশন


২.

আমরা গাইতে শুরু করি গান।

ঢুকতে শুরু করে নাচের দল।

চুল খোলা মেয়েরা অন্যমনস্ক হলে ভালো লাগে

                                                             না


৩.

জংলী হাতির দলে হরিণ ঢুকে পড়লে সক্রিয় হয়ে

                                      ওঠে গোপন ক্যামেরা

লং মার্চ শুরু হতেই

দৌড়তে থাকে কাদামাটির 

                                     পুতুল।


৪.

বস্তুত সব কিছুই রোমহর্ষক।

নদীতে ডুবে যাচ্ছে নারী।

শুকনো পাতার জঙ্গলে হলুদ রঙের

                                           ফুল।


৫.

হারিয়ে যাওয়া বেড়াল ফিরে এলে তার মাথায়

                                        পরিয়ে দেওয়া হয় টুপি

নীরবতার ভাষাকে অনুবাদ করতে গিয়ে

                                              খামারবাড়ি লিখি

ঘন হয়ে আসে সম্পর্ক।

খড়মের শব্দে দেখি জেগে উঠছে তোমার শীতল

                                                         চোখ


৬.

নূপুর হারিয়ে গেছে সেই শোকে আঠারো মাস তুই 

                                                            বিমনা

ধানক্ষেতের সামনে একটা বাড়ি।

অথবা বাড়ির সামনে ধানক্ষেত।

স্বপ্ন ভেঙে যায়।রুমাল ও পতাকা নিয়ে

                                            জলজঙ্গলে ঘুরি


৭.

সমস্ত পুতুল আজ সাজঘরে মজলিস বসায়।

প্রিয় কোন গান যখন ভাষান্তরে শুনি 

মনে হয় তরাই জঙ্গলে লণ্ঠন দুলে 

                                               উঠলো

যে ভাষায় মিছিল লিখি।

যে ভাষায় জনপদ লিখি।

সেই ভাষা নিবিড় হয়ে আসে বটবৃক্ষের ছায়ার

                                                             মত


৮.

বসন্ত উৎসবের গায়ে হেলান দিয়ে হেসে ওঠে মার্চ 

                                                         মাসের দুপুর

আমাদের সাদামাটা জীবন।

বারান্দা ও রাস্তা জুড়ে হাজার হাজার

                                                  পিচকারী।

বাতাসে আবির ওড়ে।

সর্বাঙ্গে আবির জড়িয়ে আমরা আবার গাইতে শুরু

                                                       করি গান     

 

৯.

ফাঁকা মাঠের ভেতর জোনাকি দেখেছো তুমি!

অন্ধকারে হলদে পাখির ফিসফিস।

দূরের নদীর গন্ধ,চিনি আর বাতাসার 

                                                 ক্যানভাস।


১০.

নূপুর হারিয়ে গেছে সেই শোকে আঠারো মাস তুই 

                                                            বিমনা

ধানক্ষেতের সামনে একটা বাড়ি।

অথবা বাড়ির সামনে ধানক্ষেত।

স্বপ্ন ভেঙে যায়।রুমাল ও পতাকা নিয়ে

                                            জলজঙ্গলে ঘুরি

 

কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা

কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা




ছুঁচসুতো

 

সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই

যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম

আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস

আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো

অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে

সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক

 

ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি, 

ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই

গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ

 

বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল 

টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান

এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি

কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে 

 

সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই

রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!




নাটুয়া 

 

গভীর ইঁদারাটির কাছে যাই, উঁকি মারি 

ভেতরমহলে কার, নাটুয়া শরীর!

প্রতিবিম্বে শুয়ে আছি অনন্ত তরল

জাগতিক ভ্রম মেখে অসম্ভব স্থির

 

শঙ্খলগ্ন নিয়ে কত যে বলার ছিল কথা

তিলের বিলাপ নিয়ে জটিল বিভ্রম 

হৃদিপদ্মটিতে এতদিন কাঙালপণায় 

ছিল যে রেণুবিলাস, তার কথা বলতে পেরেছি কই!

ঝরে ঝরে পড়ে গেছে অসমাপ্ত শ্রম

 

মধুলোভি মৌমাছিদের চক্রাবর্ত পথে 

নিস্ফল খুঁজেছি কিছু জান্নাতের ঘোর

সিঁঁধ কেটে নিয়ে গেছে মহাকাল চোর

 

অন্নদামঙ্গল আজও হয়নি তো পড়া 

মোহিনীরূপের ভেতরে যে

কুচযুগ মেধাবী বর্ণনা, এখনও অধরা

 

কুয়োর অতল তলে পড়ে আছে নাটুয়া শরীর 

পরনে পোশাক এক জাদুকর মায়া, জাদুর ধরম

                                      শত শত চুমকি বসানো

 

ভীষণ ধাঁধিয়ে দিই দর্শকের দৃষ্টির বিভ্রম



 

মেছুনী 

 

মেছুনির নিজেরই শরীর যেন বঁটি হয়ে থাকে

ইস্পাত কঠিন তার ভীষণ ধারালো 

ফালাফালা কেটে যায় খদ্দেরের চোখ 

পিছল শরীর তবু চরম নাব্যতা ধরে

কার্ভেচার আর ক্লিভেজের ঘরে 

থরে থরে সাজানো বন্দিস

 

মেছুনির সোমত্ত শরীরে রেণু হয়ে লেগে থাকে 

                                                    খদ্দেরের ভ্রম

ভ্রমের ভেতরে পরকীয়, অনন্ত পিপাসা

মাছের আঁশটে গন্ধ ঘেটে দেয় 

                                            ঘোরের বিভ্রম

 

বঁটির উপরে ফালা হয়, আসঙ্গ লিপ্সার থেকে 

লাফ দিয়ে নেমে আসতে চাওয়া বাঘ

 

উদাসীন মেছুনি এসবই জানে

মাছের আঁশের নিচে ঘন হয়ে জমে থাকে 

                                                     পদ্মগোখরোর থুতু

ছিটকে গেলে অন্ধ হবে কামুক বায়স

 

মরা মাছ খণ্ড খণ্ড কেটে দিতে দিতে

ভ্রূক্ষেপবিহীন সেই আগুনে মেছুনী 

শরীরী বঁটিতে আরো কৌশল ঢুকিয়ে 

নেড়ে দেয় খদ্দেরের পৌরুষের থলি

 

মরা মাছ নিয়ে থলি হাতে বাড়ি যায় সম্মোহন



 

এমন জলের কাছে 

 

এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল

তারও তো আছে এক চিত্রল হরিণ,

নিভন্ত কপাট খুলে যখন বেরিয়ে আসে 

জায়নামাজ তুলে রেখে কবিতা পড়তে বসে গালিব…

 

এমন জলের কাছে আশ্চর্য ফুটুনি নিয়ে 

কখনও যেওনা পরাশর 

তাহলে কোনদিনও পাবেই না তোমার মৎস্যগন্ধাকে… 

 

দেখবে তখন, সিন্ধুঘোটকেরা প্রকৃত দর্শন ভুলে 

এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে 

সমুদ্রতটে ঘুমিয়ে থাকা ঝিনুকের বুক।

 

এই যে রেণু রেণু গড়িয়ে পড়া জল, 

দেখ তার থরথর ঠোঁট, ঠোঁটের অলিন্দ বেয়ে

গড়িয়ে গড়িয়ে নামা রাধিকা অসুখ...



 

যজ্ঞভূমি

 

বেড়া বাধার কালে ওপাশে বন্ধন দড়িটি 

শক্ত করে ধরে রাখে যে, সেই তো আমার মা!

তবু তার গর্ভজলের গন্ধ পেয়েও বুঝতে পারিনা 

ব্রহ্মাণ্ড থেকে উঠে আসা জগৎ সর্পভ্রমে রজ্জু নয়

আর এই জগতের নাভিমধ্যে যে কুয়ো, সেখানে 

ডুব দেওয়া সহজ কথা নয়, যে পারে সেই পারে, 

তখন তার শরীর হয়ে ওঠে সেই কাঠবেড়ালির,

উন্মাদ হয়ে যে খুঁজে ফেরে প্রকৃত যজ্ঞভূমির...

 

অতলান্ত সাগরের ঢেউগুচ্ছে আলো জ্বেলে বসে আছে 

যে রমনী, তাকে একবার মা বলে ডেকে দেখ, 

ব্রহ্মের নাভি থেকে বেরিয়ে আসা শক্তির দোলা খেতেই

ডিঙি নৌকা হয়ে উড়ে যাবে অসীমের দিকে...

 

সেখানে তো কোনও পাহাড় নেই কেবল অতলের মুখ…

 

মৃত্যুর ভেতর থেকে বের হয়ে 

কতকাল ধরে লেগে থাকা অপমান মুছে

তপস্যায় যাবে সেই প্রাচীন শম্বুক...



 

মধুযামিনী

 

এমন যে রূপকল্প তার কাছে থিতু হয়ে বসি।

দেখি, সে রূপের মঞ্জরি সকল, 

অক্ষর প্রতিমা হয়ে ওরা সব ভ্রমর-ভ্রমরী,

মিথুনমূরতি মাখা রাধা মাধবের ঘাটে জলকেলি করে...

বিদ্যুৎ তরঙ্গ এসে এঁকে দেয় আলিঙ্গন কুসুম অগ্নিতে...

 

নৌকাবিলাসের দিকে এখন যাব না কিছুতেই,

উবু হয়ে বসে দেখে যাব রতিকল্প রূপ,

বৈষ্ণবের রসকলি সাজের ভেতরে

দেখব কেমন কুঞ্জবন আঁকা,

রাধাকৃষ্ণ লীলা খেলে রাসের বিস্ময়,

ললিতা বিশাখা আর চন্দ্রাবলী ঘোর...

 

এমন রূপের কাছে বসে, 

যেন গেয়ে যেতে পারি গোবিন্দের গীত, 

রাইয়ের নূপুর থেকে তুলে নিতে পারি

পয়মন্ত পরকীয়া ঘোর...

 

যেন বলতে পারি,

এই যে স্মরণে আছি সেই কি যথেষ্ট নয়?

মধুযামিনীতে ব্রহ্মকমল ফুটুক হিরন্ময়… 



 

পরাগ দোতারা

 

পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসি, ছায়া পড়ে জলে

আনন্দ-সাঁতার ধরে মাছেরা অবাক হয়ে দেখে,

জাগতিক ভ্রম মেখে কাছে আসা আশ্চর্য মানুষ!

 

জলের উপরে উঠে পাখনা নেড়ে ইশারা দেয় কত,

যেন বলে, পড়েছ কি চন্ডীদাস, পদাবলী কথা? 

রাধিকার বিনোদিয়া বিভঙ্গের ঝরে পড়া আলো

দেখেছ কেমন খুঁজে নেয় পরকীয়া বাঁশিটির

ছিদ্রপথ আলোকসম্ভব? আনপথে নূপুরের ধ্বনি 

মিলনের কাঙালপনায় জেগে ওঠা কীর্তনবাসর,

অথবা দেখেছ কোন চর্যার হরিণ,

অঙ্গ বেয়ে ঝরে পড়া নীলাভপ্রণয়?

 

বলি না কিছুই শুধু মাছেদের দেখি, আনন্দ-হ্লাদিনী…

তারা কেউ একাকিত্বে ভোগে না কখনও,

বেঁধে বেঁধে থাকে আর এ-ওর গায়ের থেকে

খুঁটে খুঁটে তুলে দেয় জমে থাকা শ্যাওলা প্রয়াস…

 

পুকুরের জল থেকে ছায়াটি তুলতে গিয়ে দেখি, 

রতিমুগ্ধ বসে আছে সিদ্ধাসনে, কবেকার 

রামী-চন্ডীদাস!



 

পতন 

 

জল পতনেরও একটা মাধুর্য আছে 

যখন তা নেমে আসে বৃষ্টি ফোঁটা হয়ে...

এসময় কিশোরী মেয়েরা এই ভার্চুয়াল সময়েও 

গোপন কুলঙ্গী থেকে বের করে তাদের নূপুর

রাই না হলেও চন্দ্রাবলী ঘোর হয়ে 

নৃত্য করে অনাবিল পিছল উঠোনে...

 

তাদের মায়েরা পুজো ঘর থেকে উঠে এসে দেখে 

মেয়েদের নাচের মুদ্রায় কত বৃন্দাবন গাঁথা হয়ে আছে...

 

অথবা ঝরনা পতনের কথা ভাবো,

মানুষের দৃষ্টি কুড়োবে বলেই অবিরাম নগ্ন থেকে নগ্নতর...

এই পতন পবিত্র বড়, প্রকৃতিগ্রন্থিত

এমন পতনের কাছে ঈশ্বরও পেতে দেয় তার হাত

যেন এক সম্মোহিত অনন্ত কাঙ্গাল...

 

স্নানঘরে জলের পতন নিয়ে কত কবি লিখেছে কবিতা...

মেঝেময় পড়ে থাকা মেয়ের স্নানের জল থেকে 

স্নেহটুকু গোপনে কুড়িয়ে রাখে সুজাতার পিতা…



 

নাচের ইস্কুল থেকে

 

নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসে যে আলোস্রোত

তার নাম ধরে নাও ঘুঙুরবিলাস...

মোহনিয়া রূপ, দেবদারু বন দিয়ে যখন ভ্রমণ 

দেবদাসীরাও উছলিয়া উতলিয়া 

কুড়োতে থাকে তার প্রসব করা শস্যদানা,

ক্যাকটাসের শরীরে বেজে ওঠে পাতাল তরল... 

 

কে এঁকেছ ব্ল্যাকবোর্ডে দাঁত দেখানো ষাঁড়?

শোনোনি অলকানন্দা অথবা গহরজান?

অনুরাগ যেদিন চুইংগাম হয়ে আঁকড়ে ধরবে দিল

আরশিনগর খুব তোলপাড়,

তখন বুঝবে ধনী, বনজ্যোৎস্নার  

আকর্ষের প্রয়োজন তো পড়েনা কোনোদিন...

 

কে এঁকেছ নকশি কাঁথায় হরিণের মাংস উত্তাপ?

নদী যখন বয়ে যাবে নৌকা সোহাগে, তার ঢেউগুলি দেখ,

তারা সব নাচের ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আসা

এক-একটি পাখি,

যাদের কোনও উপমা নেই

শুধু লিরিক্যাল মুদ্রা আর কত্থকের স্রোত...



 

পাথরের কাছে 

 

পাথরের কাছে যাই 

দেখি, প্রাণ আছে, পাখির কোমল ধ্বনি 

শোনা যায় পাতা হলে কান... 

 

রজস্বলা সমুদ্রের ঢেউগুলি গোপন নির্জন

অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে, যেন

নিজস্ব শিহর পেলে জেগে উঠবে এখনই 

 

সান্দ্র আবেগের থেকে নেচে নেচে নেমে আসে 

শ্যামের বাঁশিটি আর রাধিকা নূপুর...

 

দেখি, এক পথও আছে কুঞ্জের ঘরানা...

 

পাথরও বলেছে কথা, ভেতরমহলে এসো

উট আছে মরুভূমি, কাঁটাগুলি উদ্গাত প্রাণা...